বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশটির বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বন্দীদের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ এবং সাজা কার্যকরের আগে পরিবারকে অবহিত না করার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশটিতে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য দিয়েছে ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)।
সম্প্রতি মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনাও এ আলোচনা সামনে এনেছে। তবে ওই দুই ব্যক্তির ঘটনা ইএসওএইচআরের উল্লিখিত ১০৮ জনের হিসাবের বাইরে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে কত বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, যা দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর আগের বছর, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫। ২০১৮ সালে কার্যকর হয়েছিল ১৪৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, আর ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ১৮০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সে সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। অন্যদিকে

২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের সাজা ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধে।

ইএসওএইচআরের হিসাব অনুযায়ী, বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মোট সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে।
সৌদি আরবে সব অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তি নির্ধারণ করে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দণ্ডবিধি নেই। দেশটির বিচারব্যবস্থায় ইসলামি আইন বা শরিয়াহর ব্যাখ্যা এবং বিচারকদের বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইসলামি আইনের প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, অপরাধকে হদ, কিসাস ও তাজির এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। হদ শ্রেণির অপরাধে নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। কিসাস মূলত হত্যা বা শারীরিক আঘাতের ঘটনায় প্রযোজ্য; নির্দিষ্ট শর্তে ভুক্তভোগী বা নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা ক্ষমা কিংবা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারেন। অন্যদিকে তাজির শ্রেণির অপরাধে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচারকদের বিবেচনার সুযোগ থাকে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ হলো, এ বিবেচনামূলক ক্ষমতার আওতায় কিছু অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও মাদকবিরোধী আইনের মতো লিখিত আইনেও কয়েকটি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কেবল সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে, যা সাধারণত ইচ্ছাকৃত হত্যার মতো অপরাধকে বোঝায়। কিন্তু সৌদি আরবে মাদকসংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচিত হচ্ছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ অতীতে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ সীমিত করার বিষয়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২১ সালে তাজির শ্রেণির অপরাধে শাস্তি নির্ধারণের জন্য একটি খসড়া দণ্ডবিধির কথা জানানো হয়। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফাঁস হওয়া ওই খসড়ায় মৃত্যুদণ্ড সীমিত করার পরিবর্তে কিছু অপরাধে তা প্রয়োগের সুযোগ আরও স্পষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খসড়াটিতে হত্যা, ধর্ষণ, ধর্মদ্রোহ ও ধর্মত্যাগের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে খসড়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে পাস বা কার্যকর হয়নি।
দেশটির সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সদস্য নিয়োগ দেন বাদশাহ। মৃত্যুদণ্ডসহ গুরুতর কয়েকটি শাস্তির রায় পর্যালোচনার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। আইনে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা থাকলেও তাদের নিয়োগ ও বিচারব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলেছে।
সৌদি আরবের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো কিছু মামলায় নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে এবং সেসব স্বীকারোক্তি আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কয়েকজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মারধর, বৈদ্যুতিক শক, শ্বাসরোধ, একাকী কারাবাস এবং আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
একাধিক মামলায় নির্যাতনের অভিযোগ তোলার পরও যথাযথ তদন্ত হয়নি বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তিই দণ্ডাদেশের প্রধান বা একমাত্র ভিত্তি ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জবরদস্তির মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এ ধরনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য আদালতে ব্যবহার না করার ওপর তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।
সৌদি আরবে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে কার্যকর হওয়া ১২২টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৯২ জনই ছিলেন বিদেশি নাগরিক। ২০২৫ সালে একই ধরনের অপরাধে কার্যকর হওয়া ২৪০টি মৃত্যুদণ্ডের অন্তত ১৮৮টি ছিল বিদেশিদের।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইএসওএইচআর নথিভুক্ত ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৫৯ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। তাঁরা বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের নাগরিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বিদেশি কর্মী ও প্রবাসী। কিন্তু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে বিদেশিদের বেশি সংখ্যায় উপস্থিতি বৈষম্যমূলক প্রয়োগের আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ।
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে এ শাস্তির ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বন্দী বা তার পরিবারকে আগাম জানানোর বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর কিংবা কবরের অবস্থান জানানোর ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তার অভিযোগ রয়েছে।
কিছু বন্দীকে জানানো হয়েছিল, তাদের মামলা পুনর্বিবেচনা করা হবে অথবা সাজা স্থগিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিতে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জর্ডানের নাগরিক হুসেইন আবু আল-খায়েরের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। তার পরিবারকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাজা পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনার কথা জানানো হলেও ২০২৩ সালের মার্চে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ ধরনের ঘটনা বন্দী ও তাদের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন।
জাতিসংঘের ২০২৪ সালের সর্বজনীন পর্যালোচনায় সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে অন্তত ৩৫টি সুপারিশ করা হয়েছিল। এসব সুপারিশের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে এ শাস্তি নিষিদ্ধ করার বিষয়ও ছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সৌদি আরবকে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অধীনে নির্যাতন প্রতিরোধ এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার না করার বাধ্যবাধকতার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা কমানো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, বন্দীদের নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং পরিবারকে সময়মতো তথ্য জানানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার অব্যাহত থাকায় সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হচ্ছে।