বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

মেক্সিকোর কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিতের পর কেঁদে ফেলেন বদলি নামা নেইমার-এএফপি
বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে শুধু পরাজয় নয় বরং কোচ কার্লো আনচেলত্তির দল নির্বাচন এবং নেইমারকে বেঞ্চে রেখে ম্যাচ শুরু করার সিদ্ধান্ত। নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের হারের পর ব্রাজিলের সাবেক তারকা ফেলিপে মেলো থেকে শুরু করে বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি রোমারিও পর্যন্ত আনচেলত্তির কৌশল নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে ম্যাচ শেষে চোখের জল আর বিদায়ের ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন নেইমার।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর ম্যাচে শুরু থেকেই একাদশে ছিলেন না নেইমার। লুকাস পাকেতার অনুপস্থিতিতে তার জায়গায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে খেলান আনচেলত্তি। ম্যাচের ১৪ মিনিটেই ব্রাজিল পেনাল্টি পেলেও স্পট কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ব্রুনো গিমারাইস। দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে মার্তিনেল্লির বদলি হিসেবে মাঠে নামেন নেইমার। যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করলেও দলকে পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি নিজেই স্বীকার করেন, ব্রাজিল দলে পেনাল্টি নেওয়ার ক্ষেত্রে নেইমারই সবচেয়ে দক্ষ খেলোয়াড়। আর এই মন্তব্যের পরই তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা আরও জোরালো হয়। ব্রাজিলের সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফেলিপে মেলো বলেন, কোচকে দোষ দেওয়া সহজ হলেও এই পরাজয়ের দায় এড়ানোর সুযোগ আনচেলত্তির নেই। তাঁর মতে, শুরু থেকেই নেইমারকে খেলানো হলে প্রথমার্ধের সেই পেনাল্টিটি সম্ভবত তিনিই নিতেন এবং ব্রাজিল শুরুতেই এগিয়ে যেতে পারত। ম্যাচের শুরুতে গোল পেলে পুরো ম্যাচের গল্পই অন্য রকম হতে পারত বলে মনে করেন মেলো।

শুধু ফেলিপে মেলো নন ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক রোমারিওও আনচেলত্তির একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে ব্রুনো গিমারাইসকে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে বোধগম্য হয়নি। রোমারিওর মতে, সেই পরিবর্তনের পর ব্রাজিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং নরওয়ে ম্যাচের দখল পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। বিশ্বকাপের আগেই আনচেলত্তির চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো কোচের মূল্যায়ন হওয়া উচিত বড় টুর্নামেন্ট শেষে, তার আগে নয়।
এদিকে ব্রাজিলের বিদায়ের রাতে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দেন নেইমার। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠেই ভেঙে পড়েন তিনি। চোখের জল লুকাতে পারেননি। পরে ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, সত্যিই চেষ্টা করেছি। এখন সব শেষ।’ এই মন্তব্যকে অনেকেই ব্রাজিল জাতীয় দল থেকে তাঁর বিদায়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি তিনি।
২০১০ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকেই ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ মহাতারকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন নেইমার। পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনালদো ও রোনালদিনিয়োর উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর কাঁধে ছিল বিশাল প্রত্যাশার চাপ। প্রতিভা, গতি, ড্রিবলিং আর সৃজনশীলতায় তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও বিশ্বকাপ শিরোপা অধরাই থেকে গেছে।
নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিল বারবারের ইনজুরি। ২০১৪ বিশ্বকাপে পিঠের গুরুতর চোট তাঁকে সেমিফাইনাল থেকে ছিটকে দেয়। ২০১৮ বিশ্বকাপের আগে পায়ের চোটে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপেও গোড়ালির ইনজুরিতে গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ খেলতে পারেননি। এবারও বয়স, দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ক্লান্তি এবং পুরোনো চোটের প্রভাব তাঁর খেলায় স্পষ্ট ছিল। তবু অভিজ্ঞতা আর নেতৃত্ব দিয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
সংখ্যার বিচারে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঈর্ষণীয়। ব্রাজিলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৮টি অ্যাসিস্ট তাঁকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলারদের কাতারে বসিয়েছে। তিনি ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও। ২০১৩ সালে কনফেডারেশনস কাপ এবং ২০১৬ রিও অলিম্পিকে দেশের প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। তবু ব্রাজিলের মতো ফুটবল-উন্মাদ দেশে একজন মহাতারকার সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি বিশ্বকাপ, আর সেই ট্রফিটিই অধরা থেকে গেল।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর আনচেলত্তি বলেছেন, এই হারই নতুন এক অভিযানের শুরু। ইতোমধ্যে তাঁর চুক্তির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন। ফলে আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখেই নতুন পরিকল্পনা শুরু হবে। তবে সেই অভিযানে নেইমার থাকবেন কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ২০৩০ বিশ্বকাপের সময় তাঁর বয়স হবে ৩৮ বছর। বাস্তবতা বলছে, আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
তবু নেইমারের ক্যারিয়ারকে শুধু একটি ট্রফি দিয়ে বিচার করা কঠিন। বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও তিনি একটি প্রজন্মকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছেন, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন এবং ব্রাজিল ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবেন। তবে নরওয়ের বিপক্ষে সেই পরাজয়ের পর ব্রাজিলজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শুরু থেকেই যদি নেইমার মাঠে থাকতেন, তাহলে কি গল্পটা অন্য রকম হতে পারত?