বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ইসলামি দলগুলোর নেতারা । ছবি : সংগৃহীত
দেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীকে বাইরে রেখে কওমি মাদরাসাভিত্তিক সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে নতুন ঐক্য গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। তবে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দলগুলো।
নতুন এই ঐক্যের লক্ষ্য ইসলামি দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি কমানো এবং অভিন্ন বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করা। তবে দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান, নির্বাচনী সমঝোতা ও জোটের শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় উদ্যোগটি কতটা সফল হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১টি দল নিয়ে একটি নির্বাচনী ঐক্য গড়ে উঠেছিল। ওই জোটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ইসলামি দল যুক্ত ছিল। তবে নির্বাচনের আগে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে নতুন করে সাত দলের ঐক্য গঠনের আলোচনা শুরু হয়।

হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে আলোচনায় থাকা সাতটি দল হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
হেফাজতে ইসলাম নিজে রাজনৈতিক দল না হলেও এই উদ্যোগে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনটির নেতাদের মতে, নির্বাচনের আগে ও পরে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে যে বিভক্তি ও পারস্পরিক বিরোধ দেখা গেছে, তা কাটিয়ে ওঠাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীরউল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, সাতটি দলকে একসঙ্গে বসিয়ে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে অভিন্ন বিষয়ে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে চায় সংগঠনটি।
তবে প্রস্তাবিত ঐক্য কেবল ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জোটে রূপ নেবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।
নতুন ঐক্যে জামায়াতে ইসলামীকে অন্তর্ভুক্ত না করার পেছনে মতাদর্শগত পার্থক্যের কথা জানিয়েছেন হেফাজতের নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, আলোচনায় থাকা দলগুলো মূলত কওমি মাদরাসা ও দেওবন্দি ধারার অনুসারী। জামায়াতের সঙ্গে তাদের আকিদাগত পার্থক্য রয়েছে।
মুফতি বশীরউল্লাহ জানিয়েছেন, জামায়াতকে শত্রু মনে করে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে ধর্মীয় মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে দলটিকে প্রস্তাবিত ঐক্যে রাখা হচ্ছে না।
অন্যদিকে, সাত দলের বাইরের আরও কিছু ছোট ইসলামি দলকে ভবিষ্যতে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালউদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন, নতুন কোনো দলকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সংশ্লিষ্ট সাত দলের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
তবে জামায়াতকে এই ঐক্যে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যে জানা গেছে।
সাত দলের ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলগুলোর বিদ্যমান রাজনৈতিক সম্পর্ক। আলোচনায় থাকা কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত, কোনো কোনো দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বর্তমানে কোনো জোটে নেই।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় সাত দলের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে ওই সভায় প্রতিটি দল থেকে পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। বৈঠকে ঐক্যের একটি খসড়া রূপরেখাও উপস্থাপন করা হয়।
তবে নতুন ঐক্যে যুক্ত হওয়ার পর দলগুলো অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের মতে, সাতটি দল একত্র হওয়ার পরও যদি কোনো দল অন্য রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে এই ঐক্য কার্যকর শক্তিতে পরিণত হবে না। তাই প্রস্তাবিত সমঝোতায় থাকা দলগুলোর অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তাঁর দল।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় কয়েকটি দল। তাদের মতে, ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালউদ্দীন আহমদের বক্তব্য, অভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থে দলগুলো একসঙ্গে কর্মসূচি পালন করতে পারে। তবে রাজনৈতিক জোট গঠন কিংবা নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে প্রত্যেক দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
ফলে ঐক্যের মূল লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা এগোলেও এর রাজনৈতিক কাঠামো ও কার্যপরিধি নির্ধারণের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নতুন এই উদ্যোগকে পৃথক রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। দলটির নেতাদের ধারণা, ইসলামি দলগুলো এক প্ল্যাটফর্মে আসতে পারলে দেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র শক্তির উত্থান ঘটতে পারে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর একাংশের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে, এই ঐক্যপ্রক্রিয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে কি না। বিশেষ করে অন্য জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার শর্তটি জামায়াতকে লক্ষ্য করে দেওয়া হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
তবে এ ধরনের সন্দেহের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ সামনে আসেনি। প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও এর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

প্রস্তাবিত ইসলামি ঐক্যের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের জানিয়েছেন, ইসলামি দলগুলো নিজেদের মধ্যে কোনো প্ল্যাটফর্ম গঠন করলে তাতে জামায়াতের আপত্তি নেই।
আকিদা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থানও স্পষ্ট বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, দলটি জনগণের সঙ্গে থেকে কাজ করতে চায় এবং অন্য ইসলামি দলগুলোর ঐক্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
তবে হেফাজতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত জামায়াতের বাইরে পৃথক রাজনৈতিক জোটে পরিণত হয় কি না, তা নিয়ে দলটির কর্মী-সমর্থকদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেফাজতে ইসলাম ও ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি বৈঠকে বিএনপির রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনকে দেখা যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
তবে রাশেদ খাঁন জানিয়েছেন, ইসলামি দল ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার অংশ। হেফাজতের নেতৃত্বে সাত দলের ঐক্য গঠনের সঙ্গে এসব সাক্ষাতের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তিনি দাবি করেছেন।
সব মিলিয়ে, জামায়াতে ইসলামীকে বাইরে রেখে সাতটি ইসলামি দলকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, বিদ্যমান জোটের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সমঝোতা না হলে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা