বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

রয়টার্সের প্রতিবেদনটি মূলত নেপালের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে হলেও তাতে বাংলাদেশও আলোচনায় এসেছে। এর প্রধান কারণ হলো প্রতিবেশী দুই দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে চমকপ্রদ সমান্তরালতা। এক বছরের ব্যবধানে উভয় দেশেই জেন–জি প্রজন্মের নেতৃত্বে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটে, যা ক্ষমতার কেন্দ্রকে পরিবর্তন করে এবং দীর্ঘমেয়াদি শাসকগোষ্ঠীর শাসনাবসান ঘটায়।
নেপালে অভ্যুত্থানের পরের বছর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়। বালেন্দ্র শাহ, ৩৬ বছর বয়সী র্যাপ সংগীতশিল্পী থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া এই নেতা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হওয়া এই তরুণ নেতা আরএসপি (রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি)-এর প্রার্থী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)-এর নেতা কে পি শর্মা ওলিকে পরাজিত করেন।
নেপালের পার্লামেন্টে ২৭৫ আসনের মধ্যে সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫ আসনের ফলাফলে আরএসপি ১২৫টি আসনে জয়ী হয়। ইউএমএল মাত্র ৮টি আসনে জিতেছে, নেপালি কংগ্রেস ১৮টি এবং নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি) ৭টি আসনে জয়ী হয়। বাকি ১১০ আসন বণ্টিত হবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে, সেখানে আরএসপি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে এগিয়ে আছে। ফলস্বরূপ, দেশটিতে নতুন দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে।
আরএসপি ২০২২ সালের জুলাইতে প্রতিষ্ঠিত হলেও সেই বছরের নির্বাচনে তারা সাতটি সরাসরি আসনে জয়ী হয় এবং ভোটের অনুপাতে ১৩টি আসন পায়। ওই নির্বাচনের পর পুষ্পকমল দহলের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে সরকারে যোগ দেয় আরএসপি, এবং লামিছানে উপপ্রধানমন্ত্রী হন। এবারের নির্বাচনে এককভাবে লড়ার ফলে দলটি অভাবনীয় জয় অর্জন করে, যা তরুণ নেতাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রবেশের নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও ২০২৪ সালে জেন–জি প্রজন্মের নেতৃত্বে সফল অভ্যুত্থান ঘটে। পরের বছর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই প্রজন্মের নেতারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন। যদিও এককভাবে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, শেষপর্যন্ত তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যুক্ত হন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ৩০টি আসন এই জোটে আসে, যার মধ্যে এনসিপি ছয়টি আসনে জয়ী হয়।
নেপালের আরএসপি এবং বাংলাদেশের এনসিপি উভয়েই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে মাঠে নেমেছিল। তবে দেশ এবং নির্বাচনের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত পার্থক্যের কারণে ফলাফলে তফাৎ দেখা যায়। নেপালে নতুন ভোটার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, যেখানে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধকোটির মতো নতুন ভোটার অংশগ্রহণ করেছে। আরএসপি গুছিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, কিন্তু এনসিপি জোটবদ্ধভাবে ভোটে অংশ নিলে তাদের প্রকৃত ক্ষমতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কেন বাংলাদেশে এনসিপি সেই সাফল্য পায়নি?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এনসিপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, সংগঠনকে সমগ্র দেশে বিস্তৃত করতে না পারা এবং জোটযুক্ত নির্বাচনই মূল কারণে। পাশাপাশি, ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে তারা জনগণের কাছে একটি স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি। কিছু মতামত আছে, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন হারিয়েছে এনসিপি। এছাড়া অভ্যুত্থানের পর সংগঠন বিস্তারে মনোযোগ কম দেওয়াও এক কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, নেপালে অভ্যুত্থানকারীরা নির্বাচনের আগে দল গোছানোর সুযোগ পেয়েছে এবং প্রথাগত রাজনীতিকদের তুলনায় ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকায় তারা সাফল্য পায়। বালেন্দ্র শাহের মতো নেতারা নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিয়ে জনমতকে কাজে লাগাতে পেরেছেন।
এনসিপির নেতারা অভিযোগ করেছেন যে বিভিন্ন পক্ষের অপপ্রচার তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছে। তবু তারা জনগণের মধ্যে সমর্থন অর্জন করেছেন, এবং এনসিপির জনসমর্থন মিত্রদের কিছু আসনেও কার্যকর হয়েছে।
এনসিপির ব্যর্থতা ‘পরিবর্তনের এজেন্ট হতে না পারা’
অনেক দিন ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান। এই বিশ্লেষকের মতে, মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সেই পরিবর্তনের প্রতিভূ হিসেবে এনসিপির নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে না পারার কারণেই এমন ফলাফল হয়েছে। অন্যদিকে নেপালে আরএসপি পরিবর্তনের ‘এজেন্ট’ হয়ে উঠতে পেরেছিল বলেই তারা ক্ষমতায় যাচ্ছে।
আসিফ মোহাম্মদ শাহান গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ ও নেপাল দুটি দেশেই গণ–অভ্যুত্থান হয়েছে। তবে দুটি দেশের কনটেক্সট আলাদা। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানটি ছিল অনেক ব্যাপক। নেপালে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া আরএসপি এবং বাংলাদেশে অভ্যুত্থানে নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে পরে গঠিত এনসিপির নির্বাচনী ফলাফলে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, নেপালে নির্বাচন অনেক দ্রুত হয়েছে। ফলে ভোটে অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার একটা প্রভাব ছিল। সেই সুবিধাটা আরএসপি পেয়েছে।
আরএসপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী বালেন্দ্র শাহ এর আগে কাঠমান্ডু শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে তাঁর পরিচিতি ও অভিজ্ঞতা থাকার কথা বলেন এই অধ্যাপক। এর সঙ্গে অভ্যুত্থানের পর নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশকে যুক্ত করে আরএসপি দলকে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ও নেপাল দুটি জায়গাতেই ‘পরিবর্তনের ক্ষুধা’ ছিল মন্তব্য করে অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, নেপালে আরএসপি পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। ফলে তারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ভোটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। এনসিপি জনগণের কাছে প্রত্যাশিতভাবে যেতে পারেনি, সংগঠনের যথেষ্ট বিস্তার ঘটাতে পারেনি। অর্থাৎ, এনসিপি পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। নির্বাচনী ফল তা–ই বলছে।
যা বলছেন এনসিপি নেতারা
নেপালের সঙ্গে তুলনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এনসিপির নেতাদেরও নজর এড়ায়নি। গত শনিবার ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় এসব আলোচনার একটি জবাব দেন দলটির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, নেপালে আরএসপি অনেক আগে তৈরি হওয়া দল। তাদের সংসদে প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসও রয়েছে। এবার তারা যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল, সেটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু সেই ঘটনার সূত্র ধরে অনেকে এনসিপিকে নানা কারণে তুলনায় নিয়ে আসছেন। কিন্তু অন্তত অভ্যুত্থানের সময় পর্যন্ত যে বিএনপি বা জামায়াত অভ্যুত্থানের শক্তি ছিল, তাদের বিষয়টি অনেকেই চেপে যান। বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোকে যারা ডি-মিন করতে চায়, তারা জেনে-বুঝে একটা ফ্যালাসির পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে।
তবে গত মাসে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের বিজয়ী আবদুল হান্নান মাসউদের কথায় আত্মোপলব্ধির সুর ফুটে উঠেছিল।
তিনি বলেছিলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল আমরা এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচন করব। ৩০০ আসনে নির্বাচন করে আমরা যদি ছয়টি আসন পাইতাম, সেটা আরও বেশি সম্মানজনক মনে হইত। কিন্তু আসলে আমরা সে রকম পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। জামায়াতের সঙ্গে জোট করাটা ভুল ছিল বলব না। পরিবেশ এবং সময় সেদিকে যেতে বাধ্য করেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট না হলে এককভাবে এনসিপি হয়তো তিন-চারটি আসন পেত।