বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আধুনিকায়ন ও পরিচালনায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
চুক্তি অনুযায়ী, এনসিটির পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাবে দুবাই সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। তবে টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো ও সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের অডিটোরিয়ামে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়।
এতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এসা কাজিম।
চুক্তির আওতায় এনসিটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে। মেয়াদ শেষে টার্মিনালটি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে।
চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম দেবে। এর পাশাপাশি প্রথম ১০ বছরে আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি। বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ভাগের পাশাপাশি নির্ধারিত বার্ষিক ফিও পাবে।
চুক্তিতে কর্মদক্ষতার সূচক বা কেপিআই নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থাও থাকবে। মনিটরিং, নিরীক্ষা ও নিয়মিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তির বাস্তবায়ন তদারক করবে।
নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে। নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড শুধু টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাবে।
চুক্তির আওতায় স্থানীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো। আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক লজিস্টিক সংযোগের মাধ্যমে এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করার মাধ্যমে বন্দরের সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং পরিচালন দক্ষতা উন্নত করাই সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নতুন ব্যবস্থায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও কাগজবিহীন হবে। এতে ব্যক্তিপর্যায়ে পক্ষপাত বা অনিয়মের সুযোগ কমবে।
কাস্টমস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কনটেইনার আসার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা কাস্টমসের আওতায় যাবে এবং শুল্ক আদায়ের কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। ফলে কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরার প্রয়োজন কমবে।
আগের সরকারের সময়ে নেওয়া উদ্যোগ বর্তমান সরকার কেন বাস্তবায়ন করছে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও বন্দর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেয়। আগের সময়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যথাযথ দরকষাকষির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করে চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দল গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী ও আলোচকদের যুক্ত করে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করার পর চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
শ্রমিকদের অসন্তোষ ও আন্দোলন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, শঙ্কা ও অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাদের কোনো প্রশ্ন বা শঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্টরা তার জবাব দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেন, বাণিজ্য ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দেশের এই অগ্রযাত্রায় সহায়তা করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, চুক্তিটি টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়াবে, লজিস্টিকসের প্রতিবন্ধকতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, দেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে এনসিটির পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি। ২০০৭ সালে চালু হওয়া এই টার্মিনাল বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন করে। ২০২৫ সালে বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে হয়েছে।
বন্দরটির দক্ষতা বাড়াতে কনটেইনার অবস্থানকাল, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম এবং যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের আশা, আন্তর্জাতিক অপারেটরের আধুনিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক শিপিং নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ফলে আমদানি-রপ্তানির লজিস্টিক ব্যয় ও সময় কমবে।
এনসিটির পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যান্য টার্মিনালেও আন্তর্জাতিক অপারেটরদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসকে।
এদিকে, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার চুক্তির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার ইনভেস্ট বাংলাদেশ ভবনের বাইরে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে বিভিন্ন বামপন্থি ও সামাজিক সংগঠন।
‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের’ ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)সহ বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
সমাবেশে সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক কাফি রতন, বাসদের সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মনীষা চক্রবর্তী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসাহিদা সুলতানাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দনের বক্তব্য চলাকালে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। পরে বিক্ষোভস্থল থেকে নেতা-কর্মীদের সরিয়ে দেওয়া হয়।