বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
২০২৪ সালের জুলাই অভুত্থানের পর অর্থাৎ ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন পরবর্তী অস্থির উত্তাল সময়ে পুলিশ বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য আক্রান্ত হয় উত্তেজিত জনতার হাতে নিহত হন অনেক পুলিশ সদস্য। সেই উত্তাল সময়ের এক অবিস্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী এক পুলিশ কর্মকর্তা। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বেচ্ছায় পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তার সঙ্গে আলাপের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিবেদন।

যেভাবে ঘটনা শুরু: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত উত্তপ্ত। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলার খবর ছড়িয়ে পড়ছিল। পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যই তখন অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও অসহায়তার মধ্যে দিন পার করছিলেন।
এই সংকটময় মুহূর্তে যখন সবাই নিজেকে নিরাপদ করার জন্য ব্যস্ত ঠিক তখনই, সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম-নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে এমন একটি উদ্যোগ নেন, যা হয়তো প্রতি বিপ্লবের মাধ্যমে বড় ধরনের পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছিল।
এই ঘটনাটি কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাহসিকতার গল্প নয়; এটি সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মোহাম্মদপুর থানার সেই রাত: ৫ আগস্ট ২০২৪, রাত প্রায় ০১১টা ৩০ মিনিট। ধানমন্ডির শংকর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় পরিবার নিয়ে অবস্থান করছিলেন সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম। হঠাৎ তার মোবাইলে ফোন আসে পরিচিত এক পুলিশ সদস্য এসআই ইয়াহিয়ার কাছ থেকে।
ফোনের অপর প্রান্তে আতঙ্কিত কণ্ঠ- মোহাম্মদপুর থানায় কিছু দুষ্কৃতকারী আগুন দিয়েছে, সরকারি মালামাল লুট করছে। থানার ছাদে আটকে থাকা পুলিশ সদস্যরা জীবনভয়ে কান্নাকাটি করছে।
খবরটি শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি জাহিদুল ইসলাম।তিনি দ্রুত মোটরসাইকেলে করে মোহাম্মদপুর থানার উদ্দেশে রওনা দেন। স্থানীয় কিছু পরিচিত মানুষের সহযোগিতা নিয়ে প্রায় ৩০–৪০ জন সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি থানার সামনে পৌঁছান।
সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একদল মানুষ থানা এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালাচ্ছে। স্থানীয়দের সহায়তায় ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়। সেই রাতেই ভোর পর্যন্ত তারা থানার নিরাপত্তায় অবস্থান করেন। পরে সেনাবাহিনী এসে দায়িত্ব নেওয়ার পর সবাই সেখান থেকে ফিরে যান।
৬ আগস্টের সকাল: আরেকটি ভয়াবহ খবর।
পরদিন ৬ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে আবার ফোন আসে এসআই ইয়াহিয়ার কাছ থেকে। তিনি জানান যাত্রাবাড়ী থানার সামনে অনেক পুলিশ সদস্যের অর্ধগলিত বীভৎস লাশ পড়ে আছে। খবরটি শুনে আরেকটি আশঙ্কাজনক তথ্য সামনে আসে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের অনেক ক্ষুব্ধ পুলিশ সদস্য অস্ত্র নিয়ে যাত্রাবাড়ীতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
যদি শত শত সশস্ত্র পুলিশ সেখানে পৌঁছে যেত, তাহলে ক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হতে পারত। এ সংঘর্ষ শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের মতো ভয়াবহ রূপ নিতে পারত।
পরিবারের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে যাত্রাবাড়ির পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জাহিদুল ইসলাম একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি ভাবলেনÍযদি আগে গিয়ে নিহত পুলিশ সদস্যদের লাশ উদ্ধার করা যায়, তাহলে হয়তো ক্ষুব্ধ পুলিশ সদস্যদের প্রতিশোধমূলক অভিযানে যাওয়া ঠেকানো যাবে। তিনি স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নেন।
তার নিজের ভাষায় "এটা হয়তো জীবনের শেষ বিদায়ও হতে পারত। সহকর্মীদের নিরুৎসাহ: মালিবাগ সিআইডি অফিসের সামনে কয়েকজন ব্যাচমেটের সঙ্গে দেখা হয়। তাদের কাছে বিষয়টি বললে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ মজা করেই বলেন, “যাত্রাবাড়ী গেলে হয়তো লাশ হয়ে ফিরতে হবে। আসো আমরা তোমার সাথে একটা ছবি তুলি। এই সেলফিটাই হতে পারে আমাদের শেষ স্মৃতি।” তবুও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি জাহিদুল ইসলাম।
হাজারো মানুষের মাঝে একা যাত্রাবাড়ী এলাকায় পৌঁছে তিনি দেখেন হাজার হাজার (৬০/৭০ হাজার) বিক্ষুব্ধ মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছে। যদি তারা বুঝতে পারত যে তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা, তাহলে হয়তো মুহূর্তেই তার জীবন শেষ হয়ে যেত। তাই তিনি সেখানে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ে উপস্থাপন করেন। চতুর কৌশলে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তিনি স্থানীয়দের সহায়তায় একটি ট্রাক জোগাড় করেন। ফায়ার সার্ভিস থেকে বডি ব্যাগ সংগ্রহ করে তিনি নিহত পুলিশ সদস্যদের লাশ সংগ্রহ শুরু করেন। এই পুরো সময়টিতে তিনি ছিলেন জনতার মাঝখানে-মুখে গামছা বাঁধা, পরিচয় গোপন রেখে।
এক পর্যায়ে এক যুবক এসে তার কানে কানে বলে-“স্যার, আমি আপনাকে চিনে ফেলেছি।” সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল- সম্ভবত এটাই তার জীবনের শেষ মুহূর্ত। কিন্তু অসাধারণ ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেন।
রাজারবাগে ফিরে আসা: অবশেষে ৮টি লাশ ট্রাকে তুলে তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ফিরে আসেন। সেখানে শত শত ক্ষুব্ধ পুলিশ সদস্য অপেক্ষা করছিলেন। লাশ দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
কিন্তু একই সঙ্গে তারা বুঝতে পারেন- কেউ একজন নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সহকর্মীদের মরদেহ ফিরিয়ে এনেছেন।
সম্ভাব্য ভয়াবহতা: যদি সেদিন রাজারবাগ থেকে শত শত সশস্ত্র পুলিশ যাত্রাবাড়ীর দিকে রওনা দিত তাহলে কী হতে পারত? সম্ভাব্য দৃশ্যপট ছিল ভয়াবহ- পুলিশ ও জনতার সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষ, ব্যাপক প্রাণহানি!
রাজধানীতে নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা, সারা দেশে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষের বিস্তার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া অর্থাৎ পরিস্থিতি জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারত।
রাজারবাগে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা : পরবর্তী কয়েকদিন তিনি রাজারবাগে অবস্থান করে ক্ষুব্ধ পুলিশ সদস্যদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। ৬ আগস্ট থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে পুলিশের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। এই সময় অনলাইনে সারাদেশের পুলিশ লাইনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়।
দেশের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ বাহিনী যাতে আবার ডিউটিতে মোতায়েন হয়, সেজন্য পুলিশকে উৎসাহ জোগানোর জন্য সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে তখনকার গভীর রাতে ঢাকা শহরে লাঠি নিয়ে পাহারা রত সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে প্রথমে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরবর্তী সময়ে পুলিশ পরিচয় দিয়ে, সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে তা ভিডিও করে পুলিশ সদস্যদের দেখিয়ে তাদেরকে কাজে নামাতে সাহস যুগিয়েছেন। রাজারবাগী অবস্থানরত বিক্ষুব্ধ সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা মাঝে মাঝে তাকে ভুল বুঝে অস্ত্রসহ আক্রমণ করার জন্য আসলেও দেশের জন্য ডিপার্টমেন্টের জন্য এবং সিনিয়র অফিসারদের নির্দেশনার কারণে তিনি রাজারবাগ ছাড়েননি। সহকর্মীদের মধ্যেও তার ছিল ভয়ংকর রকমের ঝুঁকি। একপর্যায়ে যখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে ছিল পুলিশ কর্ম বিরতি দিয়েছে। তখন শান্তি প্রিয় মানুষ নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছিল। অপরদিকে অপরাধীরা বিভিন্ন বাসা -বাড়ি দোকানপাটে লুটপাট শুরু করেছিল। যা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে বড় রকমের একটা বিপর্যয় শুরু হতো। তখন পুলিশ যে কর্ম বিরতি দেয়নি তা বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ দিয়ে পুলিশের অবস্থান নিয়ে, একটি সাহসী বিবৃতির প্রয়োজন ছিল। কোন মহল থেকে সে বিবৃতি না আসায়, ঠিক তখন উল্লেখিত পরিদর্শক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নিজের জীবনের চিন্তা না করে বিবৃতি দিয়েছিল। যা দেখে সাধারণ মানুষ আশান্বিত হয়েছিল এবং সরে আসে সংগঠিত অপরাধ সংগঠন থেকে অপরাধীরা।
তাই ০৫ তারিখের পূর্বে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে, পুলিশের যে রকম বিতর্কিত ভূমিকার রয়েছে। ঠিক তেমনি এদেশ এবং জাতিকে নিরাপদ করার জন্য পুলিশ সদস্যদের অনন্য সাহসী ভূমিকাও রয়েছে। তাই মাননীয় আইজিপি মহোদয় সম্প্রতি এক বক্তব্যে যথার্থই বলেছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সকলের উচিত শুধুমাত্র নেতিবাচক মন্তব্য না করে মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানানো। তাহলে সম্ভব আমাদের কাঙ্খিত দেশ গড়া।