বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। বাণিজ্য, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও বৈদেশিক বিনিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই সরকারপ্রধানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তি বিনিময়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা জানিয়েছে জাপান। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার এসেছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার সিদ্ধান্তকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের সরকারপ্রধানের আলোচনায় দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও বিস্তৃত করে অর্থনীতি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করবে।
নতুন এই সম্পর্কের আওতায় আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন যা প্রায় ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, বিনিয়োগের প্রত্যাশা জানিয়েছে জাপান।
এই বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করা এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ যাচাই করতে শিগগিরই জাপানি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দুই দেশের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে দুই দেশ জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), বাণিজ্য, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিদেশি বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জাপানের দীর্ঘদিনের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। দেশটির সহায়তা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি এবং অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
এখন সেই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করে উৎপাদন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপান সফরের অংশ হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, সফরকালে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের আলোচনার ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
সমঝোতা স্মারকগুলোর মাধ্যমে সহযোগিতার যেসব ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়েছে, সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি ও সমঝোতার সুফল যেন বাস্তব বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি ‘বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চল’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানান, এ উদ্যোগকে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সমৃদ্ধি ভাগাভাগির একটি কার্যকর কাঠামো হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ, শিল্পায়ন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে তা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনতে পারে।
জাপানের দৃষ্টিতেও এ সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অবকাঠামো, বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিরাপত্তা খাতেও বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করার কথা জানিয়েছে জাপান। বিশেষ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে টহল জাহাজ দেওয়ার নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স (ওএসএ) এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়েও অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা, সামুদ্রিক সম্পদ ও বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তাবিষয়ক যোগাযোগ আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে জাপানের একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান প্রথম দিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি। এরপর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপানের অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তার বক্তব্যে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে ভবিষ্যৎমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতায় রূপান্তরের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সামনে বিদ্যমান বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলা, যা বর্তমান জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনবে।
তিনি জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায়িক সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
অন্যদিকে সানায়ে তাকাইচিও নতুন কৌশলগত অংশীদারত্বের অধীনে দুই দেশকে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানান সানায়ে তাকাইচি। এ সময় তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে দুই দেশের সরকারপ্রধানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরু হয়।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পরবর্তী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
সব মিলিয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের সূচনা, বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রত্যাশা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, সমঝোতার কার্যকর প্রয়োগ এবং দুই দেশের ধারাবাহিক সহযোগিতার ওপর।