বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার ও উড়োজাহাজ অবতরণের ফি বাবদ ২৭টি বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক)। দীর্ঘদিনের এই বকেয়ার বড় অংশই আটকে আছে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের কাছে। ফলে পাওনা আদায়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ।
বেবিচকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব বকেয়া জমেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৮টি এয়ারলাইন্সের কাছে পাওনা ৬৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। বর্তমানে ফ্লাইট পরিচালনাকারী তিনটি এয়ারলাইন্সের কাছে বকেয়া রয়েছে ৪২ কোটি টাকা। এগুলো হলো ভারতের স্পাইসজেট ও অ্যালায়েন্স এয়ার এবং তুর্কমেনিস্তান এয়ারলাইন্স। এ ছাড়া কার্যক্রম স্থগিত বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হওয়া ছয়টি এয়ারলাইন্সের কাছে পাওনা আরও ৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
চালু এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে স্পাইসজেটের কাছে বেবিচকের পাওনা সবচেয়ে বেশি। ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার ও অবতরণ ফি বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে বকেয়া জমেছে ৩৪ কোটি টাকা।
বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে এয়ার ডেকানের কাছে ১৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং আলিতালিয়া এয়ারলাইন্সের কাছে ১২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম জানান, উড়োজাহাজের আকার ও ওজন অনুযায়ী বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে উড়ে যাওয়ার জন্য প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে ৩০০ থেকে ৪৫০ ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হয়। আকাশসীমায় প্রবেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত ব্যবস্থায় একবারই এ ফি দিতে হয়। বিল পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধের নিয়ম রয়েছে।
বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছে বেবিচক। সংস্থাটির সদস্য (অর্থ) মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত জুনেও এ ধরনের চিঠি পাঠানো হয়।
তবে কোনো এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে গেলে পাওনা আদায় কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নিতে যে ব্যয় হয় তা পাওনা অর্থের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে জানান তিনি।
বকেয়া পরিশোধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন আটকে দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে বেবিচক। জেট এয়ারওয়েজের কিছু অর্থ বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলার খবর পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি জানানো হলে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ করা হয় বলে জানান নাজমুল হক।
বর্তমানে ফ্লাইট পরিচালনাকারী তিনটি বকেয়াদার এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে শুধু স্পাইসজেটের পক্ষ থেকে উত্তর পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি বকেয়ার পরিমাণ নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। তাদের এক মুখপাত্র জানান, পাওনার হিসাব মেলানো ও এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বকেয়া আদায়ে জটিলতা থাকলেও বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার থেকে বেবিচকের আয় বেড়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ খাতে আয় হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে আয় ছিল ৫০২ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং ২০২৪ সালে ছিল ৪৪৩ কোটি ১২ লাখ টাকা।
একই সময়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রমকারী উড়োজাহাজের সংখ্যাও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে মোট ১ লাখ ২১ হাজার ৫১৬টি ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৪টি।
বেবিচকের কর্মকর্তাদের মতে, গত জানুয়ারিতে নতুন রাডার চালুর পর আকাশসীমা পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে। তবে আয় বৃদ্ধির পেছনে শুধু রাডার চালুকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না তারা।
ভারতে আকাশসীমা ব্যবহারের ফি আদায়ের দায়িত্ব পালন করে এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এএআই)। সংস্থাটির নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো এয়ারলাইন্সের বকেয়া তার ব্যাংক গ্যারান্টির ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে সেই গ্যারান্টি ভাঙিয়ে পাওনা আদায়ের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে আগাম অর্থের বিনিময়ে সেবা দেওয়া বা ফ্লাইট পরিচালনায় বিধিনিষেধ আরোপের ব্যবস্থাও রয়েছে।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় আকাশসীমা ব্যবহারের ফি বিল পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না করলে বকেয়ার ওপর মাসে ২ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করা যেতে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলাম মনে করেন, বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের দেশে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমানের মতে, স্বয়ংক্রিয় বিল তৈরি ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া জমেছে। তিনি বলেন, অনেক দেশে বিল তৈরি থেকে অর্থ পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় তা বাস্তবায়িত হয়নি।
মফিদুর রহমানের মতে, নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা বকেয়াদার এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় বিলিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করেও পাওনা আদায়ের উদ্যোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
এয়ার কমোডর নূর-ই-আলম জানান, নতুন সমন্বিত রাডার ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের আকাশসীমায় উড়োজাহাজের চলাচল আগের তুলনায় বিস্তৃতভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। এতে ফ্লাইটের তথ্য নথিভুক্ত না হওয়ার ঝুঁকি কমেছে এবং ফি আদায়ের হিসাব আরও নির্ভুল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ সক্ষমতাও বেড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় উড়োজাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায় নিশ্চিত করতে শুধু নজরদারি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বয়ংক্রিয় বিলিং, নিয়মিত তাগাদা, কার্যকর আইনি ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের সমন্বয়ই পারে বেবিচকের পাওনা আদায়ের পথ সহজ করতে।