বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি : সংগৃহীত
দেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আট মাস পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফিরতে পারেননি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।
দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদ এখনও প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রে নির্বাচিত সরকার থাকলেও তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনির্বাচিত প্রশাসনই কার্যত বহাল রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়েও এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বক্তব্যে সময়সূচি নিয়ে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসকদের দায়িত্ব আর কতদিন থাকবে।
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা তখনও দায়িত্বে ছিলেন। এর মধ্যে অনেকের মেয়াদ শেষ হয়েছে, আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক জনপ্রতিনিধি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন না। এতে স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি উঠেছিল। তখন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় নির্বাচন হওয়া উচিত। দলটির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবেও স্থানীয় সরকারকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আট মাস পরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের একটি প্রাথমিক সাত ধাপের রোডম্যাপ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এতে ১২ নভেম্বর, ১৩ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর, ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে সম্ভাব্য ভোটের তারিখ হিসেবে রাখা হয়। তবে সেটি চূড়ান্ত সূচি ছিল না।
এর পরদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম জানান, নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তারিখ সম্পর্কে মন্ত্রণালয় অবগত নয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়, প্রস্তুতি সভা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
পরে নির্বাচন কমিশনের সচিব জানান, ওই রোডম্যাপ ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করার কথা ছিল। তবে ওই বৈঠকের পরও ১২ নভেম্বর থেকে নির্বাচন শুরুর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। পরবর্তী সময়ে কমিশনের পক্ষ থেকে জুনের মধ্যে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা, ফেব্রুয়ারিতে রমজান এবং এরপর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি রয়েছে। ৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকায় তার আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ দুর্বল হয়। নাগরিকদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সংবিধানের ১১ ও ৫৯ অনুচ্ছেদে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, দেশের অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সাংবিধানিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবেও নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি আদালতে দণ্ডিত হলে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগের কথা থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণভাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা করা উচিত নয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দ্রুত আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার অভিযোগ, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে এটি রাজনৈতিক অভিযোগ, যার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও স্থানীয় নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, বিএনপি দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের কথা বললেও বর্তমানে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ ও নির্বাচন বিলম্বের বিষয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে বিএনপির নেতারা স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। দলটির এক যুগ্ম মহাসচিবের দাবি, বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন চায় এবং দলীয়ভাবে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বাছাই চলছে। তিনি জানান, তৃণমূলের কমিটি গঠন ও প্রার্থী যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, সরকার যথাসময়ে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করবে এবং নির্বাচন কমিশনও সে অনুযায়ী কাজ করছে। তার ভাষ্য, বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে চায় না।
সব মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রত্যাবর্তন হয়নি। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সময়সূচি স্পষ্ট না হওয়ায় প্রশাসকদের অধীনেই আরও কিছুদিন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান চলবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।