বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এর প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামেও পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষ।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩২ থেকে ৩৬ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে স্বল্পমেয়াদে খুব বেশি বিকল্প ছিল না বলে মনে করছেন কয়েকজন অর্থনীতিবিদ। তবে একই সঙ্গে তারা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর বাজার নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনে দেশে কম দামে বিক্রি চালিয়ে যাওয়ার মতো সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নেই। আবার দেশের তুলনায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানির দাম বেশি হলে চোরাচালান ও কালোবাজারির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। কারণ বাস-ট্রাক, সেচ, উৎপাদন কার্যক্রম এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব বিভিন্ন পণ্যের দামে পড়তে পারে।
তবে জ্বালানির দাম বাড়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরা যেন যৌক্তিকতার চেয়ে বেশি হারে পণ্যের দাম না বাড়ান, সেদিকে সরকারকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। তবে এর ফলে মূল্যস্ফীতির মধ্যে নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা ব্যারোমিটারের মতো—এর মূল্য বাড়লে অন্য পণ্য ও সেবার ওপরও প্রভাব পড়ে। তবে জ্বালানির দাম যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি হারে যেন পণ্যের দাম না বাড়ে, তা নিশ্চিত করতে সরকারি নজরদারি প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, জ্বালানি তেল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে এর দাম বাড়লে অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব তৈরি হয় এবং পণ্য ও সেবার ব্যয়ও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম কম রাখতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। সেই চাপ মেটাতে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করা হলে উল্টো মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন মুসলিম চৌধুরী। তার মতে, ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যেসব দপ্তরের কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়েছে, সেখানে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো যেতে পারে। সাশ্রয় হওয়া অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা ও সরাসরি সহায়তায় ব্যবহার করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম এম আকাশও মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং এর প্রভাব পণ্যের দামে পড়বে। ফলে বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
তার মতে, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও যখন বাড়বে, তখন একই ব্যয়ে বেশি উৎপাদনের জন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে কম বা অনিয়মিত আয়ের মানুষের ওপর। যারা আগে থেকেই আর্থিকভাবে দুর্বল, তাদের কেউ কেউ আরও সংকটের মধ্যে পড়তে পারেন। তাই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
চলতি বছরের শুরুতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৪, পেট্রোল ১১৮ এবং অকটেন ১২২ টাকা। ফেব্রুয়ারি থেকে চার ধরনের জ্বালানির দাম ২ টাকা করে কমানো হয়।
এরপর ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০, পেট্রোল ১৩৫ এবং অকটেন ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়।
সবশেষ ২০ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৩ টাকা বা ৩২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। একই সময়ে কেরোসিন ৪১ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পেট্রোল ৪২ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং অকটেন ৪৩ টাকা বা ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং সরকারি ব্যয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।