বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ফাইল ছবি
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে যাচ্ছে। প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে পাঠানোর পরিকল্পনায় কর্মপ্রত্যাশীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হলেও কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন এবং পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা।
বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে মালয়েশিয়া ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করেছে। এর আগে বাংলাদেশ সরকার দেশটির কাছে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠিয়েছিল। ফলে এতগুলো প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে মাত্র ২৫টি এজেন্সি কীভাবে নির্বাচিত হলো, কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং তাদের যোগ্যতা কী—এসব বিষয় এখন সামনে এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২৫টি এজেন্সি মালয়েশিয়ার নিজস্ব যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এজেন্সিগুলোর সক্ষমতা যাচাই করেছে। বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি ভূমিকা ছিল সীমিত বলেও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে।
তবে এখানেই উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—২৫টি মূল এজেন্সি ও ৩১২টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কী হবে? তাদের মধ্যে আর্থিক সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত হবে? আর একজন কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অতীতে সীমিতসংখ্যক এজেন্সির প্রভাব, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবার নতুন করে বাজার খোলার সময় এজেন্সি নির্বাচনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
শুধু ২৫টি এজেন্সি নির্বাচিত হয়েছে বলেই তাদের সিন্ডিকেট বলা যায় না। কারণ, সরকারের দাবি অনুযায়ী নির্বাচনটি মালয়েশিয়ার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় হয়েছে। তবে এজেন্সিগুলোর বাছাইয়ের মানদণ্ড প্রকাশ না করা হলে প্রশ্ন ও সন্দেহ থেকেই যেতে পারে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, শ্রমিকদের অভিযোগ এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
প্রথম পর্যায়ে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনাকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বোয়েসেলের মাধ্যমে এই কর্মীরা পাঠানো সম্ভব হলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কম খরচে বিদেশে কর্মী পাঠানোর একটি কার্যকর মডেল তৈরি হতে পারে।
তবে ‘বিনা খরচে’ যাওয়ার সুযোগটি কীভাবে পাওয়া যাবে, কারা আবেদন করতে পারবেন, নির্বাচন হবে কীভাবে এবং কোথায় আবেদন করতে হবে—এসব তথ্য স্পষ্ট করা জরুরি।
কারণ, সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানানো না হলে দালালচক্র এই সুযোগকে কেন্দ্র করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করতে পারে। টাকা দিলেই তালিকায় নাম তোলা যাবে—এমন প্রচারণা চালিয়েও কর্মপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা এজেন্টকে টাকা, পাসপোর্ট কিংবা মেডিক্যাল পরীক্ষার নামে অর্থ না দেওয়ার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ায় যেতে একজন কর্মীর মোট কত টাকা খরচ হবে এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
ভিসা, মেডিক্যাল পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিমানভাড়া, সরকারি ফি ও এজেন্সির সার্ভিস চার্জ প্রতিটি খাতের ব্যয়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন অর্থ কাকে এবং কী কারণে দেওয়া যাবে, সেই তথ্যও কর্মীদের জানাতে হবে।
শুধু মোট খরচ নির্ধারণ করলেই হবে না; পুরো লেনদেনকে স্বচ্ছ করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। সেখানে নিয়োগকর্তার পরিচয়, চাকরির ধরন, বেতন, চুক্তির শর্ত, অনুমোদিত অভিবাসন ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সির তথ্য প্রকাশ করা গেলে কর্মীরা নিজেরাই তথ্য যাচাই করতে পারবেন।
২৫টি মূল এজেন্সির পাশাপাশি ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী হিসেবে যুক্ত করার বিষয়টিও নজরদারির দাবি রাখে।
কোন প্রতিষ্ঠান কী দায়িত্ব পালন করবে, মূল এজেন্সির সঙ্গে তাদের চুক্তি কী ধরনের হবে এবং শ্রমিকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কতটা—এসব বিষয় আগেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
কারণ মূল এজেন্সির সংখ্যা সীমিত হলেও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যদি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে শ্রমিকের ওপর আর্থিক চাপ কমবে না।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন সমঝোতায় রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের পদ্ধতি, কর্মীর সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয়, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব, চাকরির চুক্তি ভঙ্গ হলে প্রতিকার এবং শ্রমিকের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা স্পষ্ট থাকা দরকার।
শুধু কতজন কর্মী যাবে, সেই সংখ্যা নির্ধারণ নয়—বিদেশে যাওয়ার পর তাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে, সেটিও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বাজার খোলার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি দালালচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে কিংবা সীমিতসংখ্যক এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে নতুন এই সম্ভাবনাই শ্রমিকদের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
তাই এবার সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কতজন কর্মী বিদেশ গেলেন—তা হওয়া উচিত নয়। বরং কত কম খরচে, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং কতটা নিরাপদে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যেতে পারলেন—সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
সরকারি ব্যবস্থায় ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে পাঠানোর উদ্যোগ সফল হলে সেটিকে বৃহত্তর অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল আবেদন, সরাসরি নিয়োগ, নির্ধারিত ব্যয়, এজেন্সির জবাবদিহি এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের খোলার এই সুযোগ বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করছে তেমনি এটি দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিরও বড় পরীক্ষা। নতুন বাজার যেন পুরোনো অনিয়ম বা সিন্ডিকেটের পুনরাবৃত্তির সুযোগ না হয়ে ওঠে এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।