বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

দেশের প্রতিটি নাগরিককে একটি মাত্র সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয়পত্রের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই শিশুরা এই পরিচয়পত্র পাবে এবং আজীবন স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ রাষ্ট্রের যাবতীয় সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি একক পরিচিতি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সার্বজনীন এই কার্ডটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা সংক্ষেপে ‘এক-আইডি’।
নাগরিকদের জন্য একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র তথ্যসমৃদ্ধ ডিজিটাল কার্ড প্রণয়নের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ (ডি-স্টার) শীর্ষক নতুন একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। চূড়ান্ত অনুমোদনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পটি ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশে শিশুদের জন্মের পর প্রাথমিক সনদ হিসেবে জন্মনিবন্ধন দেওয়া হয় এবং ১৮ বছর পূর্ণ হলে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদান করা হয়। নতুন কাঠামোর আওতায় বয়স নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিককে সরাসরি একক পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এর ফলে যেকোনো নাগরিক সেবা পেতে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরে নাগরিকদের একই ব্যক্তিগত তথ্য বারবার উপস্থাপন করার বিড়ম্বনা থাকবে না।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একক এই স্মার্ট পরিচয়পত্র চালু হলে পর্যায়ক্রমে বিদ্যমান বিভিন্ন আলাদা কার্ডের প্রয়োজনীয়তা বা কার্যকারিতা আর অবশিষ্ট থাকবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষক কার্ডের মতো বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত সব কার্ডের সেবাই এই নতুন কাঠামোর মধ্যে সমন্বিত করা হবে; তবে এর বিস্তারিত কারিগরি নকশা এখনও চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা প্রথম আলোকে জানান, বর্তমানে দেশে নানামুখী কার্ড চালু থাকলেও সেগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের তীব্র অভাব রয়েছে। যার কারণে একই ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধন বা দুটি পাসপোর্টের মতো অসঙ্গতি তৈরি হয়। প্রস্তাবিত নতুন পরিচয়পত্রটি হবে স্থায়ী ও একক। নতুন জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুও এই কার্ড পাবে, যার ফলে ভবিষ্যতে নাগরিকদের আলাদা কোনো কার্ড বহনের প্রয়োজন পড়বে না।
একক ডিজিটাল পরিচয়পত্র বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া ও ভারতের মতো ডিজিটাল ডেটাবেজ পরিচালনাকারী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও মডেল পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ প্রস্তাবিত এই পরিচয়পত্র ব্যবস্থার মূল দর্শন নির্ধারণ করেছেন ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’। অর্থাৎ প্রতিটি নাগরিকের কেবল একটি কার্ড থাকবে, যা তাঁর সার্বিক ডিজিটাল নাগরিক পরিচিতি বহন করবে এবং একই সঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। তবে কার্ডটিতে দৃশ্যমান বা মেমোরি চিপে সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, তা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।
প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য ডেটাবেজ ও কার্ড তৈরির মূল পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। তবে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ও জরুরি ব্যাকআপ বিবেচনায় মোট ২০ কোটি পলিকার্বোনেট চিপযুক্ত কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতিটি আধুনিক চিপযুক্ত কার্ডের উৎপাদন ও মুদ্রণ বাবদ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ মার্কিন ডলার (বর্তমান বিনিময় মূল্যে প্রায় ২৪৬ টাকা)।
এর বাইরে মাঠপর্যায়ে কার্ড বিতরণ ও সমন্বিত সরবরাহ কার্যক্রমে ইউনিট প্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ১ ডলার বা ১২৩ টাকা। সেই হিসাবে উৎপাদন, মুদ্রণ, ডাটাবেজ ম্যাপিং, সরবরাহ ও বিতরণ মিলিয়ে প্রতিটি কার্ডের পেছনে সমন্বিতভাবে ব্যয় হবে ৩৬৯ টাকা।
সমগ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থাৎ ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা সরকার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে এবং অবশিষ্ট ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প ঋণ হিসেবে সংগৃহীত হবে। বরাদ্দের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হবে মূলত কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, নাগরিকদের বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও আইরিশ স্ক্যান) তথ্য সংগ্রহ এবং তা তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণের পেছনে। শুধু এ খাতেই সামগ্রিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
বর্তমানে দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ (টিআইএন) বহুবিধ স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর প্রচলিত রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিদ্যমান এনআইডি, সিভিল রেজিস্ট্রেশন, পাসপোর্ট, লাইসেন্স ও ট্যাক্স ডেটাবেজগুলোর মধ্যে সমন্বিত আন্তঃসংযোগ (এপিআই ইন্টিগ্রেশন) প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে নাগরিকদের কাছ থেকে একই তথ্য বারবার সংগ্রহের অপচয় ও ভোগান্তি অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব।
এদিকে বিএনপি সরকার নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তায় ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, প্রবাসী কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে কেবল ফ্যামিলি কার্ড তৈরি ও তৃণমূলের তথ্যভান্ডার সংগ্রহে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ড ব্যবস্থাপনায় খরচ ধরা হয়েছে ৬৮১ কোটি টাকা। তবে প্রবাসী কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ড প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
চলমান অর্থনৈতিক চাপ ও আর্থিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ‘এক-আইডি’র মতো বিপুল ব্যয়ের প্রকল্প গ্রহণ নিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র মতামত দেখা গেছে। একাংশের মতে, জাতীয় রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না থাকা সত্ত্বেও নতুন মেগা প্রকল্পের আর্থিক চাপ বাজেটকে আরও সংকুচিত করতে পারে। তবে অন্য পক্ষের মতে, প্রকল্পটি পাঁচ বছর মেয়াদে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে বলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর এককালীন বড় ধরনের চাপ নাও পড়তে পারে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি অবকাঠামোকে পরিমার্জন করে একক নাগরিক কার্ডে রূপান্তর করা সম্ভব। এর আওতায় ১৮ বছরের কম বয়সীদেরও ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এমন একটি বৃহৎ প্রকল্প নেওয়ার আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিয়ে নীতিনির্ধারকদের আরও গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।