বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ফাইল ফটো
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে সরকারের কাজের মূল্যায়নও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন খাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কতটা বাস্তবে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পেরেছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে শুধু সাফল্য বা ব্যর্থতার মাপকাঠিতে বিচার না করে রাষ্ট্র পরিচালনার গতি, অর্থনীতি, জনসেবা, প্রশাসন, জ্বালানি ও সামাজিক নিরাপত্তায় পরিবর্তনের চিত্র দেখা প্রয়োজন। কারণ ছয় মাস একটি সরকারের জন্য খুব দীর্ঘ সময় নয়, আবার একেবারে অল্পও নয়। এ সময়ে সরকারের অগ্রাধিকার ও কর্মপদ্ধতির একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করা যাবে না। এসব পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর সুফল কতটা পৌঁছেছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি অর্থনীতি। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা সহজ নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ এখনো রয়েছে। বাজারে চাল, ডাল, মাছ, সবজি, ওষুধ ও বাসাভাড়ার বাড়তি চাপ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক পরিবর্তন অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর। নীতি সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে।
তবে অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করার ওপর।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সরকারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। শিল্পকারখানায় গ্যাসের ঘাটতি হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, কমে কর্মসংস্থান ও রপ্তানির সম্ভাবনাও।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতিতে শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সরকার এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল সচল করা এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সাময়িক ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় একটি সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ডকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিতে এসব কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ ধরনের কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন হলে পুরো উদ্যোগটি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রেও শুধু সার-বীজের সহায়তা নয়, কৃষকের উৎপাদন খরচ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, ঋণ, বাজার ও ন্যায্যমূল্য সব বিষয়কে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
দেশজুড়ে খাল পুনঃখনন ও বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচি পরিবেশ ও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার জলাবদ্ধতা কমানো, জলাধার রক্ষা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নেও এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু খাল খনন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ না হলে আবারও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
একইভাবে বৃক্ষরোপণের সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গাছগুলো কতদিন টিকে থাকে। তাই রোপণের পাশাপাশি পরিচর্যা ও সংরক্ষণে নজর দিতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে অবকাঠামো বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার পথ সহজ করা প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, জরুরি সেবা, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং দক্ষ চিকিৎসক নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও শুধু নতুন কারিকুলাম বা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নয়, দক্ষ শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সাধারণ পরিবারের সন্তান যেন অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে মানসম্মত শিক্ষা বা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয় এটাই হওয়া উচিত সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনের সংস্কৃতি দ্রুত বদলায় না। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ কাটিয়ে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ।
নতুন সরকার যদি যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করতে পারে তাহলে প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে আগের সরকারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে দলীয়করণের সংস্কৃতি তৈরি করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখাই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সরকার বলছে। পাচার হওয়া অর্থ ও অবৈধ সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না বানিয়ে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের বাইরে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
দুর্নীতি দমনে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ তদন্ত এবং কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে সরকার।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক যেমন জরুরি, তেমনি বাণিজ্য, জ্বালানি, শ্রমবাজার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আরও স্পষ্ট। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে কি না, তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়বে কি না, হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া সহজ হবে কি না এসব প্রশ্নের উত্তরই সরকারের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের ভিত্তি হবে।
রাজনৈতিক ম্যান্ডেট সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। এখন সেই সুযোগকে কার্যকর ফলাফলে রূপ দেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ।
সার্বিকভাবে তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে বলা যায় আশাব্যঞ্জক সূচনা, তবে পরীক্ষার বড় অংশ এখনো বাকি।
সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, জনগণের জীবনযাত্রায় কতটা স্বস্তি আসে এবং প্রশাসনে কতটা জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয় আগামী সময়েই তার উত্তর মিলবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য বড় বড় ঘোষণা দিয়ে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাধ্যমেই বিচার হবে।