বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ -ছবি : সংগৃহীত
মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান এখন আর শুধু সীমান্তঘেঁষা অপরাধ নয়; প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করছে দেশ-বিদেশে। অপরাধের এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার প্রণয়ন করেছে ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’। সরকারের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে তৈরি এই নতুন আইন মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত ‘মানবপাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ বিষয়ক জাতীয় অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধ এবং মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে নতুন আইনটি অত্যন্ত কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, অপরাধীদের প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশ যৌথভাবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, নিরাপত্তা, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই শক্তিশালী আইন, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে এসব অপরাধ দমনে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে নতুন এই আইনে।
তিনি বলেন, সদ্য প্রণীত আইনটি আন্তঃদেশীয় এসব গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অপরিহার্য।
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এতে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এতদিন একই পরিসরে আলোচিত দুটি ভিন্ন ধরনের অপরাধের তদন্ত ও বিচার আরও নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হবে। পাশাপাশি অভিবাসী চোরাচালান দমন ও বিচারের জন্য একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার পরিচালনার ক্ষমতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার সুযোগ সম্প্রসারণও নতুন আইনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, আইনটিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘নন-পানিশমেন্ট প্রিন্সিপল’ বা ভুক্তভোগীদের শাস্তি না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে নয়, ভুক্তভোগী হিসেবে বিবেচনা করে তাদের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই আইনের অন্যতম লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ। এসব অপরাধ শুধু অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে শোষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আইনের শাসনকে দুর্বল করে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তাই অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন, অপরাধী চক্র ভেঙে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
জাতীয় অবহিতকরণ সভায় জানানো হয়, নতুন আইন সম্পর্কে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অভিন্ন ধারণা তৈরি এবং তদন্ত থেকে বিচার নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সমন্বয় নিশ্চিত করাই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে আইনটির মূল বিধান, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নতুন আইন প্রণয়নের প্রেক্ষাপট, এর প্রয়োজনীয়তা এবং প্রধান বিধানসমূহ তুলে ধরেন। পরে আইন বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), বিচার বিভাগ, প্রসিকিউশন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তর, কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের নতুন বাস্তবতায় কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়; আইনটির কার্যকর প্রয়োগ, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই নির্ধারণ করবে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে বাংলাদেশের নতুন আইনের সাফল্য।