বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ এমন মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। অর্থনীতির ভাষায় যা জনমিতিক লভ্যাংশ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং চীনের মতো বহু দেশ এই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’
রোববার (১২ জুলাই) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য। তাই আজকের তরুণদের আগামী দিনের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। আর তা করতে না পারলে এই সম্ভাবনাই একসময় বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের তরুণ সমাজ একটি সুখী-সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ দেখতে চায়। তারা এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করে, যেখানে মেধা, যোগ্যতা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হবে; সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে; কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং প্রত্যেক নাগরিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পাবে। তরুণদের এই আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্ন পূরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের নীতি, কর্মসূচি ও পরিকল্পনায় তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, মানসম্মত ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও শক্তি। উন্নয়নের মূল ভিত্তি। সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। আবার অপরিকল্পিত ও অদক্ষ জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জনসংখ্যার আকারে নয়; বরং সেই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে অদক্ষ ও কর্মসংস্থানহীন বাড়তি জনসংখ্যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, শ্রমবাজার, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। সৃষ্টি করে নতুন-নতুন সংকট। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ জনসংখ্যা ও এর গুণগত মান উন্নয়নই আজ আমাদের অন্যতম জাতীয় অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে আমাদের যে অভিযাত্রা-তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার ঘোষিত আর্থ-সামাজিক মুক্তির ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম দফা ছিল ‘জনবিস্ফোরণ রোধ করা’। ১৯৭৬ সালে তার নেতৃত্বে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ গঠন করা হয়। প্রণীত হয় ‘জনসংখ্যা নীতি’। জনসংখ্যা সমস্যার সমাধানে তিনি মানুষের দোরগোড়ায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়াসহ ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, পরবর্তীকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জনমিতিক লভ্যাংশ থেকে সর্বাধিক সুবিধা প্রাপ্তির লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেন। তিনি বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্তসহ সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবার কল্যাণ কার্যক্রম কার্যকরভাবে সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসূচি চালু করেন। ফলে বাল্যবিবাহের হার কমে আসে, নারীদের সচেতনতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অবকাঠামোর তুলনায় আমাদের জনসংখ্যার চাপ অত্যন্ত বেশি। এর সঙ্গে দ্রুত নগরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, পরিবেশগত ঝুঁকি, সীমিত বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা কেবল পরিবার পরিকল্পনা বা স্বাস্থ্যখাতের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুশাসন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ যুগে বিশ্ব অর্থনীতি ও শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের তরুণদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত (STEM), কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনী দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং কর্মসংস্কৃতির মতো জীবনদক্ষতারও বিকাশ ঘটাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং শ্রমবাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলে এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যা আমাদের তরুণদের দেশীয় ও বৈশ্বিক-উভয় শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম করে তুলবে।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত পরিবার একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও টেকসই জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু হাস এবং জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও আগের তুলনায় কমেছে। এই অর্জন ধরে রাখতে হলে স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান আরও উন্নত করতে হবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছেও সমানভাবে মানসম্মত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের সামনে এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এরমধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও মোট জনসংখ্যার বিশাল ভিত্তির কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু জন্মগ্রহণ করছে। ফলে দেশের মোট জনসংখ্যা এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে অবহেলার কারণে গত প্রায় দেড় দশক ধরে মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate) দুই দশমিক তিন-এ স্থির রয়েছে। কিন্তু, সাম্প্রতিক সময়ে এটা বাড়াছে বলে সমীক্ষায় উঠে আসছে। দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে এ হারকে দুই এর কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং তা ধরে রাখা আবশ্যক। মনে রাখতে হবে, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ও জরুরি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। অশিক্ষিত ও পশ্চাৎপদ পরিবারে জন্মহার তুলনামূলক অনেক বেশি। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে সেভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বিয়ের গড় বয়স বৃদ্ধি এবং কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম সামাজিক অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার স্বাস্থ্যকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ‘বিনা চিকিৎসায় কোনো মৃত্যু নয়’ এই মানবিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আধুনিক, কার্যকর ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। এই জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা প্রমুখ।