বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী সৃষ্টির যত্ন ও পরিচর্যার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে মানবসমাজের সম্পর্ক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করলে একটি করে গাছ লাগিয়ে সেই জন্ম উদযাপন করবেন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২৬ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
'বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ' এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২৬ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ এবং বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫ প্রদান করেন। একই সঙ্গে সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীদের মধ্যে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ তিনি বলেন, নদী-নালা, গাছপালা, কীটপতঙ্গ, বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীসহ পরিবেশ-প্রতিবেশের সবকিছুই মানুষের জন্য উপকারী। তবে এসব সৃষ্টি থেকে উপকার পেতে হলে সেগুলোর যত্ন ও পরিচর্যা করা মানুষের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সঙ্গে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে মানবসমাজের সম্পর্ক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। বাস্তুতন্ত্রের নিরাপদ লালন ও বিকাশের সঙ্গে মানবসমাজের নিরাপদ বেড়ে ওঠা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণে পরিবেশ মেলা ও বৃক্ষমেলার আয়োজন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। এ আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণকে শুধু বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। তাহলেই একটি স্বাস্থ্যকর বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিচক্ষণ শিক্ষার্থী ও প্রতিশ্রুতিশীল তারুণ্যই একটি ‘সবুজ বসতি’ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
সবুজায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য সবুজায়ন অপরিহার্য। একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করলে একটি করে গাছ লাগিয়ে প্রতিটি প্রাণের জন্ম উদযাপনের আহ্বান জানান তিনি। একজন নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠুক এভাবেই সবুজায়নের সামাজিক আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
তিনি জানান, পরিবেশ সংরক্ষণে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালু, ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্ট-আপ ফান্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গঠন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি নিয়েছে। তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, কোন পরিবেশে, কী ধরনের মাটিতে, কী আবহাওয়ায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো উচিত, তা গবেষণার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির মতো দ্রুত বর্ধনশীল গাছ পরিবেশের জন্য কতটা উপযোগী, সেটিও গবেষণার বিষয় বলে উল্লেখ করেন। নতুন বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতির ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয়, বনজ, ফলদ, অর্থকরী ও বিপন্ন প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বনায়নের উদ্দেশ্য শুধু গাছ লাগানো নয়; বরং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে পশুপাখি, বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গ নিরাপদ আবাসস্থল ও প্রয়োজনীয় খাদ্য পাবে। গাছপালা, প্রাণী, মাটি, পানি ও বায়ু সবকিছু স্বাভাবিকভাবে মিলেমিশে থাকতে পারে, এমন বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন গাছ লাগানো জরুরি হলেও রোপিত গাছ নিরাপদে বেড়ে উঠছে কি না, তা নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের অংশ হয়ে যাওয়া বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সরকার বন উজাড়, পাহাড় কাটা, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস ও বন্যপ্রাণী নিধনের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানান।
তিনি বলেন, মাটি, নদী, বন, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা মানবসমাজের নিজেদের স্বার্থেই জরুরি। নদী রক্ষা করা না গেলে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। উন্নয়ন ও পরিবেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রেখে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। এ লক্ষ্যে ছাদবাগান, নগর বনায়ন, জিআইএসভিত্তিক বৃক্ষরোপণ, নদীতীর ও খালের দুই পাশে সবুজায়ন এবং ইকো-ট্যুরিজমকে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত করতে চায় সরকার।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং জনজীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এ বাস্তবতায় সরকার পরিবেশকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এতে শুধু কৃষকদের বছরজুড়ে সেচসুবিধাই নিশ্চিত হবে না, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের সব নগর, বন্দর ও শহরতলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে সরকার কাজ শুরু করেছে। জৈব সার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং 'রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল (৩আর)' নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদী ও জলাভূমি ভরাট এবং বন উজাড়ের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে বন্য প্রাণী, পোষ্য প্রাণী ও পশুপাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে মানবসমাজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি বন্য প্রাণীর প্রতি নির্দয় না হওয়ার এবং কুকুর-বিড়ালের প্রতি অমানবিক আচরণ না করার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষে জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার এবং সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশ অর্জনকারীদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। 'দেশ হোক সকল প্রাণী ও প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল' এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি করে জলপাই, জারুল ও নিমগাছের চারা রোপণ করেন। পরে পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে আয়োজিত বৃক্ষমেলা ও পরিবেশমেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে জাতীয় বননীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশে বৃক্ষরোপণকে রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে রূপ দেন। পরে খালেদা জিয়া ১৯৯৪ সালে জাতীয় বৃক্ষমেলার সূচনা এবং অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সমন্বয়ে একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে।
ঢাকায় পরিবেশ মেলা ও মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষমেলার পাশাপাশি দেশের সাতটি বিভাগীয় সদর, ৫৬টি জেলা সদর এবং ২৯টি উপজেলায় তিন দিনব্যাপী বৃক্ষমেলার আয়োজন করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, ন্যাশনাল ট্রি ডাটাবেজ এবং ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে বনায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর মাধ্যমে সাড়ে তিন লাখের বেশি নতুন সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি শুধু একটি সরকারি কর্মসূচি নয়, বরং একটি জাতীয় আন্দোলন।