বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে বেরিয়ে মালয়েশিয়ার পর চীনকে দ্বিতীয় গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া তারেক রহমানের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্যের প্রেক্ষাপটে এই সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বরং এটি এমন এক সময়ের সফর যখন বাংলাদেশকে একই সঙ্গে উন্নয়ন-অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে হচ্ছে, আবার বহির্বিশ্বের চাপ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত বাস্তবতাও সামলাতে হচ্ছে। এ কারণেই চীনের রাষ্ট্রীয় প্রভাববলয়ের সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী কলাম বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা উসকে দিয়েছে।
কলামটি লিখেছেন সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক লিউ জংজি। তার পর্যবেক্ষণ, ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পশ্চিমা প্রভাব, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নীতিগত দ্বিধা কাটিয়ে ওঠা।

তারেক রহমানের এই সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ। প্রথমত, নতুন সরকারের প্রধান হিসেবে তা

র বিদেশ সফরের সূচনাতেই চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ধারণা করা হচ্ছে সফরটিতে ১৫টিরও বেশি সমঝোতা স্মারক, সহযোগিতা চুক্তি বা সমন্বিত ঘোষণাপত্র সামনে আসতে পারে, যার মধ্যে অবকাঠামো, শিল্প, বাণিজ্য, উৎপাদন, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো খাতগুলো গুরুত্ব পাবে। তৃতীয়ত, এই সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তববাদী অবস্থানকে কতটা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে সেটিও এখন একটি বড় প্রশ্ন। কারণ বাংলাদেশ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে একদিকে চীন তার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-অংশীদার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত, জাপানসহ আরও কয়েকটি শক্তির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো মানে শুধু নতুন চুক্তি নয়, বরং একটি বৃহত্তর কৌশলগত বার্তা।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ভিত্তি অবশ্য নতুন নয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নানা স্তরে এই সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে।

গত এক দশকে সেই সম্পর্কের গভীরতা আরও বেড়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার, আবার বাংলাদেশের বেশ কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পেও চীনা অর্থায়ন, প্রযুক্তি বা নির্মাণ সহায়তা রয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা, শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ, উৎপাদনভিত্তিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব সব মিলিয়ে বেইজিং বাংলাদেশকে শুধু একটি বাজার হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনাময় উৎপাদন ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও দেখছে।
গ্লোবাল টাইমসের কলামে বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলো যেমন তুলে ধরা হয়েছে তেমনি স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জের কথাও বলা হয়েছে। লিউ জংজির মতে, এই সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিতে হলে অন্তত তিনটি বড় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে ঢাকাকে। প্রথমটি হলো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বহিরাগত প্রভাবের প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়া এখন শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্র নয়, এটি বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ। ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনা বিশ্লেষকের বক্তব্য হলো, কিছু পশ্চিমা শক্তি বাংলাদেশকে নিজেদের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কাঠামোর ভেতরে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করতে চাইছে, আর সেই প্রক্রিয়ায় চীন–বাংলাদেশ সহযোগিতার কিছু প্রকল্প বা ধারণাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ‘ঋণফাঁদ’, ‘অতিরিক্ত নির্ভরতা’, ‘কৌশলগত প্রভাব’ এ ধরনের শব্দবন্ধ ব্যবহার করে চীনা সম্পৃক্ততাকে সন্দেহের চোখে দেখানোর প্রবণতাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে বিষয়টি শুধু পশ্চিমা প্রচারণা বা বহিরাগত প্রতিযোগিতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। লিউ জংজি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বড় ধরনের শিল্প সহযোগিতা, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের জন্য যে নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা সব সময় সমানভাবে দৃশ্যমান থাকে না। সরকার পরিবর্তন, নীতির অগ্রাধিকার বদল, প্রশাসনিক জটিলতা, বাস্তবায়নে ধীরগতি কিংবা রাজনৈতিক মেরুকরণ এসব বিষয় বিদেশি অংশীদারদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। নতুন সরকার হিসেবে তারেক রহমানের প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কি তারা প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতার পর্যায়ে রাখবে, নাকি এটিকে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের কাঠামোয় রূপ দেবে? শুধু সমঝোতা স্মারক সই করলেই সম্পর্ক গভীর হয় না; বাস্তবায়ন, ধারাবাহিকতা এবং নীতির স্থিতিশীলতাই সেখানে মূল বিষয়।

চীনা বিশ্লেষকের তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণটি হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চীনকে ঘিরে দৃষ্টিভঙ্গিগত দ্বিধা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, উচ্চপদস্থ মহল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের একটি অংশ এখনো পশ্চিমা উন্নয়ন-চিন্তা, অর্থনৈতিক তত্ত্ব এবং শাসনব্যবস্থার মডেল দ্বারা প্রভাবিত। ফলে চীনের রাষ্ট্র-নির্দেশিত উন্নয়ন মডেল, অবকাঠামোকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা কিংবা উৎপাদন-নির্ভর বিনিয়োগ কৌশলকে সবাই একই চোখে দেখেন না।
বাংলাদেশের একাংশ চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সুফল উপলব্ধি করলেও, অন্য অংশটি আশঙ্কা করে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হবে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ অসন্তুষ্ট হবে কি না, কিংবা আঞ্চলিক ভারসাম্যে কোনো প্রভাব পড়বে কি না। লিউ জংজি এই মানসিক ও নীতিগত দ্বিধাকেই ঢাকা–বেইজিং সম্পর্কের অগ্রযাত্রায় একটি অন্তর্নিহিত বাধা হিসেবে দেখছেন।
চীন–বাংলাদেশ সম্পর্কের আলোচনায় আরেকটি বড় প্রসঙ্গ হলো বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা। বাংলাদেশের বাজারে চীনা পণ্যের প্রবল উপস্থিতি রয়েছে, কিন্তু চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান তুলনামূলক দুর্বল। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে একটি বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।
সমালোচকেরা প্রায়ই বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যত গভীর হয়েছে, বাংলাদেশের বাজার তত বেশি চীনা পণ্যে ভরে গেছে। কিন্তু চীনা বিশ্লেষকের বক্তব্য, এই সমস্যাকে শুধু ‘চীনা পণ্যের আধিক্য’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। বরং বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সীমিত বৈচিত্র্য, শিল্পোৎপাদনে মূল্যসংযোজনের ঘাটতি, প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনে পিছিয়ে থাকা, সরবরাহ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং বাজার সম্প্রসারণে কৌশলগত দুর্বলতাও বাণিজ্য ঘাটতির বড় কারণ। অর্থাৎ চীন যদি বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধাও দেয় তবু সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হলে বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এই জায়গায় চীনের সঙ্গে শিল্প সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে যদি তা কেবল পণ্য আমদানি-রপ্তানির সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যৌথ উৎপাদন, কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নের দিকে যায়।
চীনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ শুধু একটি ভোক্তা বাজার নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদনকেন্দ্র। তুলনামূলক কম শ্রমব্যয়, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সম্ভাবনা, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং তরুণ কর্মশক্তি—এই সব কারণেই বাংলাদেশে উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে চীনের আগ্রহ বাড়ছে।
গ্লোবাল টাইমসের কলামেও বলা হয়েছে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করা হতে পারে যাতে এখানকার শ্রমসুবিধা কাজে লাগিয়ে উচ্চ-মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরি করা যায়। এটি যদি বাস্তব রূপ পায় তাহলে বাংলাদেশ শুধু আমদানিনির্ভর বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে শিল্পভিত্তিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন নীতিগত নিশ্চয়তা, জমি-বিদ্যুৎ-লজিস্টিকস সুবিধা, বিনিয়োগ-সহায়ক পরিবেশ এবং দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা। রোহিঙ্গা সংকট, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ, এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলোতে চীন নিজেকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চায়। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, চীন–দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো, এবং বিভিন্ন ত্রিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক ফোরামের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কথাও বলা হচ্ছে।
এই কাঠামো বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে বিশেষত যদি তা শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খলে প্রবেশ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে কাজে লাগে। তবে বাংলাদেশের জন্য এখানে বড় প্রশ্ন হলো, এসব প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ কতটা জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সেগুলো কতটা বাস্তব ফল দেবে।
লিউ জংজির কলামে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা ছিল ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিকে সত্যিকার অর্থে অগ্রাধিকার দেওয়া। এই আহ্বানের কূটনৈতিক তাৎপর্য গভীর। এর একদিকে আছে চীনের প্রত্যাশা—বাংলাদেশ যেন পশ্চিমা চাপ বা অস্বস্তির হিসাব না কষে নিজের স্বার্থে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও জটিল। বাংলাদেশের জন্য ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে হতে পারে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য সব অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে একমাত্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৌশলগত স্বাধীনতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে আসল কাজটি ‘চীন না পশ্চিম’ এই দ্বিমুখী ফ্রেমে আটকে যাওয়া নয়; বরং নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সফরকে কেবল চীন সফর হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; এটি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম বড় পরীক্ষা। এই সফর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরও উত্তর দেবে। যেমন : ঢাকা কি চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের পর্যায়ে রাখবে, নাকি শিল্প, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে? পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর জন্য কী ধরনের কূটনৈতিক ভাষা ও নীতি অনুসরণ করবে? বড় প্রকল্পের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ কি চীনা বিনিয়োগকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে পারবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, নতুন সরকার কি নীতিগত ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার এমন বার্তা দিতে পারবে, যা বিদেশি অংশীদারদের আস্থা বাড়াবে?
বাংলাদেশের সামনে তাই সুযোগ যেমন বড় তেমনি ঝুঁকিও কম নয়। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অবকাঠামো, শিল্প, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আবার অতিরিক্ত নির্ভরতা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, ভূরাজনৈতিক সন্দেহ এবং কৌশলগত চাপও তৈরি হতে পারে। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই ঢাকাকে পথ খুঁজতে হবে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যদি সত্যিই জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক হতে চায়, তাহলে তাকে একই সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী, বাস্তববাদী এবং বহুমাত্রিক হতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা যাবে কিন্তু সেই সম্পর্ক যেন একমুখী নির্ভরতায় পরিণত না হয়; পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যাবে, কিন্তু সেই সম্পর্ক যেন বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত না করে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের চীন সফর সেই ভারসাম্যের পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই সফরে কতগুলো চুক্তি সই হলো, কত বড় বিনিয়োগ এল, বা কী ধরনের কূটনৈতিক ভাষ্য সামনে এলো সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সফরের পর বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের চরিত্র কীভাবে বদলায়। সম্পর্ক কি আরও গভীর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নেবে, নাকি আগের মতোই প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? পশ্চিমা প্রভাব, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত দ্বিধা কাটিয়ে ঢাকা কি বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি আত্মবিশ্বাসী কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে? আপাতত সেই উত্তরই খুঁজছে কূটনৈতিক মহল।