বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি : সংগৃহীত
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাদক ব্যবসার মূল নেটওয়ার্ক, অর্থদাতা বা ‘গডফাদার’ শনাক্তের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ফলে আইনটি বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করলেও অপরাধের গভীরে পৌঁছানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রণীত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশোধনীর খসড়া আজ (বৃহস্পতিবার) মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। খসড়ায় প্রতিটি জেলা ও মহানগরে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে গুরুতর শাস্তিযোগ্য মামলাগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা যাবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের বিচার এসব ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান মামলাগুলোর স্থানান্তর, বিচারিক এখতিয়ার ও আপিল কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবটি মূলত বিচারিক কাঠামোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক অনুসন্ধান এবং মাদক সিন্ডিকেটের শিকড় উন্মোচনের বিষয়গুলো এতে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
খসড়ার উদ্দেশ্য অংশে বলা হয়েছে, মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধের কারণে হত্যা, চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আদালতের চাপ কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতেই ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিচার দ্রুত হলেও তদন্ত দুর্বল থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। জব্দতালিকা, আলামত সংরক্ষণ, রাসায়নিক পরীক্ষা ও সাক্ষ্যগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এখনও বড় সমস্যা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, “মাদক মামলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘসূত্রতা এবং বড় কারবারিদের আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করা। বিচার দ্রুত হলে শাস্তির নজির তৈরি হবে, যা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।”
ডিএনসি সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ছয় লাখের বেশি মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় কিংবা ভাসমান সাক্ষীর ওপর নির্ভরতার কারণে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মাদক ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক, অর্থদাতা বা সিন্ডিকেট পরিচালনাকারীদের আলাদা করে চিহ্নিত করার কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো নেই। ‘মাদক সিন্ডিকেট’, ‘অর্থদাতা’ বা ‘সুবিধাভোগী’ এ ধরনের শব্দগত সংজ্ঞাও আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
ফলে অভিযোগ রয়েছে, আইনটি কার্যকর হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহক, খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীরাই আইনের আওতায় আসবে, কিন্তু মূল নিয়ন্ত্রকেরা আড়ালেই থেকে যাবেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মাদক ব্যবসার বড় অংশই একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ব্যাংকিং লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সম্পদ অনুসন্ধান এবং অর্থপাচার সংক্রান্ত তদন্ত বাধ্যতামূলক করা হলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারীদের চিহ্নিত করা সহজ হতো।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাদক মামলার তদন্ত শুধু উদ্ধার পর্যন্ত সীমিত থাকে। কিন্তু মাদক কোথা থেকে আসে, কারা অর্থায়ন করে এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে আসা জরুরি।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, তদন্তে দুর্বলতা এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক আসামি শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যান। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর অনেকেই আর আদালতে উপস্থিত হন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধুমাত্র বাহক বা খুচরা পর্যায়ের ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সীমান্ত, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন পথ দিয়ে মাদক প্রবেশের পেছনে যারা কাজ করে, তাদের চিহ্নিত করা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে দ্রুত বিচার ব্যবস্থার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তদন্ত ও আর্থিক অনুসন্ধানের কাঠামো শক্তিশালী না হলে আইনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে না।
তারা আরও মনে করেন, অর্থনৈতিক তদন্ত, সম্পদ যাচাই এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক অপরাধ শনাক্তে বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা গেলে মাদক ব্যবসার মূল উৎসে আঘাত করা সম্ভব হতো।
সব মিলিয়ে আইন সংশোধনের এই উদ্যোগ বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করার সম্ভাবনা তৈরি করলেও মাদক চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলার ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা নিয়েই আলোচনা চলছে।