বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শুরুতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত হাম ও হাম উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৩১১-এ পৌঁছেছে। নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ৫২ জন আর সন্দেহভাজন মৃত্যু ২৫৯ জন। শুধু ২৪ ঘণ্টায় ১৭ শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে যা এখন পর্যন্ত এক দিনের সর্বোচ্চ। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে এবং অধিকাংশ শিশু হাসপাতালে জটিল অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে।
হাম যা রুবেলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট অত্যন্ত সংক্রামক। শিশুদের মধ্যে আক্রান্ত হলে দ্রুত নিউমোনিয়া, হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির জটিলতা দেখা দিতে পারে। হাসপাতালে যেসব শিশু ভর্তি হচ্ছে তাদের অনেকেই লাইফ সাপোর্ট সত্ত্বেও বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এ বছর ৪১,৭৯৩ জন শিশু হাম বা হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে যার মধ্যে ২৮,৮৪২ জন ভর্তি হয়েছে। তবে শনাক্ত হয়েছে মাত্র ৫,৪৬৭ শিশু। মূলত কিটের সীমাবদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা প্রদানের কারণে প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে বিলম্বে চিকিৎসা গ্রহণ, শিশুদের পূর্বেকার স্বাস্থ্য সমস্যা, অপুষ্টি এবং টিকার অভাব। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৫১০টি শিশু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে, যেখানে মারা গেছে ২২ জন।
শিশুদের হাসপাতালে আনার ক্ষেত্রে অনেক অভিভাবক দেরি করছেন ফলে জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের আইসিইউ ও অক্সিজেন সুবিধা সীমিত যা কিছু শিশুর প্রাণ বাঁচাতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। এপ্রিল মাসে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু হয়, এরপর ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম চলছে।
তবে টিকা নেওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কমপক্ষে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে মে মাসের শেষভাগ বা জুনের শুরুতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমতে শুরু করবে।
বিশেষজ্ঞরা শিশুদের হাসপাতালে আনার জন্য ছয়টি লক্ষণ লক্ষ্য করার পরামর্শ দিচ্ছেন: শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, তরল খাবার বা বুকের দুধ খেতে না পারা, বারবার বমি, খিঁচুনি বা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা, মুখ বা চোখের সমস্যা এবং তীব্র পানিশূন্যতা বা অপুষ্টি। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, রোগীদের আইসোলেশন এবং আইসিইউ ও অক্সিজেন সুবিধা বৃদ্ধি করলে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।
বর্তমানে শিশু হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণের চাপ এখনও প্রবল। ঢাকার হাসপাতাল ছাড়াও জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শিশুদের রেফার করা হচ্ছে।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হামজনিত নিউমোনিয়ায় ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ক্ষেত্রে অক্সিজেন ওষুধের কাজ করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা আছে। সব শয্যা শিশুদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত না। ভেন্টিলেটর বা আইসিইউর প্রয়োজন আছে ঠিকই। কিন্তু স্বল্পমূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে বেশিসংখ্যক শিশু উপকৃত হতো।
শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, কোভিড–১৯ মহামারির সময় হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত করা হয়েছিল। রোগীদের উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দেওয়ার জন্য হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখনো তা করা গেলে কিছু শিশুর মৃত্যু হয়তো ঠেকানো যেত।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও শিশুরোগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব রোগীর হাসপাতালে আসার বা আনার দরকার নেই। অনেকে ভয় পেয়ে শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে আসছেন, ভর্তি করাচ্ছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে হামের প্রকৃত রোগী হয়তো ভর্তি হতে পারছে না। সরকারি পরিসংখ্যানও তা–ই বলছে।
এ ক্ষেত্রে ছয়টি লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে হাসপাতালে আনতে হবে ১. রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে বা শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হলে, বুকের খাঁচা দেবে গেলে; ২. তরল খাবার বা বুকের দুধ খেতে না পারলে; ৩. বারবার বমি হলে; ৪. খিঁচুনি, নিস্তেজ, তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ডাকে সাড়া না দিলে; ৫. মুখে ঘা, চোখে সমস্যা, চোখ খুলতে না পারলে এবং ৬. তীব্র পানিশূন্যতা বা অপুষ্টিতে ভুগলে।
বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, রোগী ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মোতাবেক রোগী আইসোলেশন করলে হাসপাতালে রোগী কমবে। কম রোগী মনোযোগ বেশি পাবে। এতে মৃত্যু কমবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঢাকার বাইরেও আইসিইউ ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে সংক্রমণ হ্রাস পাচ্ছে। তবে শিশুদের মৃত্যু রোধে হাসপাতালের আইসিইউ শয্যা, হাই ফ্লো অক্সিজেন এবং যথাযথ চিকিৎসা সরবরাহ এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা মে মাসের শেষভাগ বা জুনের শুরুতে কমতে পারে। তবে দ্রুত শনাক্তকরণ, কার্যকর রোগ ব্যবস্থাপনা এবং টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখার মাধ্যমে শিশুমৃত্যু কমানো সম্ভব। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, হাসপাতালের সুবিধা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হলে এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে।