বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আমলাতান্ত্রিক পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এই পদে নিয়োগকে ঘিরে একদিনের ব্যবধানে একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি, বাতিল ও পুনঃনিয়োগ-জনপ্রশাসনের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের প্রাক্কালে এবং নতুন সরকারের শপথের ঠিক আগমুহূর্তে এমন দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন প্রশাসনের ভেতরে স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়াকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কিন্তু সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সেটি বাতিল করা হয়। একই দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব (চুক্তিভিত্তিক) ড. নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যেই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে মুখ্য সচিবের পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এস এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া; এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জারি করা হয়েছে।
ঘটনাপ্রবাহ এখানেই শেষ নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর বিসিএস প্রশাসন ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা ড. শেখ আব্দুর রশিদকে দুই বছরের চুক্তিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রায় আট মাস আগেই তাঁর নিয়োগ বাতিল করা হয়। একটি সূত্রের দাবি, তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই সিদ্ধান্তটি হয়েছে। তবে প্রশাসনের ভেতরে মাঠ প্রশাসনে ডিসি ও ইউএনও নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক চাপের প্রসঙ্গও আলোচনায় আছে।
জ্যেষ্ঠতার রেওয়াজ বনাম চুক্তির ধারা: বাংলাদেশের প্রশাসনিক রেওয়াজ অনুযায়ী, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে থাকা কর্মকর্তাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন। কিন্তু গত এক দশকে একাধিকবার এই রেওয়াজে ব্যত্যয় ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে অবসরপ্রাপ্ত বা চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের শীর্ষপদে নিয়োগের প্রবণতা বাড়ে। যুক্তি ছিল-দীর্ঘ সময় এক রাজনৈতিক আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকা এড়িয়ে ‘নিরপেক্ষতা’ নিশ্চিত করা। তবে এই যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দাযিত্ব শেষ হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহত ছিল। এতে প্রশাসনে দ্বৈত মানসিকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তাদের একটি অংশ। একদিকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার যুক্তি, অন্যদিকে পেশাগত জ্যেষ্ঠতার মর্যাদা-এই টানাপোড়েনের মধ্যে শীর্ষপদে ঘন ঘন রদবদল প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসনে বিতর্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা (ইউএনও) নিয়োগ নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে সমালোচনা হয়। অভিযোগ ছিল, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুকূল কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করা হয়েছে। নির্বাচনপূর্ব সময়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সরকার বিব্রত হয়।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শীর্ষপদে দ্রুত রদবদল আংশিকভাবে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এর কৌশলও হতে পারে। যদিও নতুন সরকারের শপথের আগের দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব পরিবর্তন রাজনৈতিক বার্তা বহন করে-এমন মতও রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনী বিজয়ের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত মিলছিল। নতুন সরকার নিজের আস্থাভাজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চাইবে-এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা।
শপথের আগমুহূর্তে পরিবর্তন: রেওয়াজ অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ সচিবই মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের প্রশাসনিক সমন্বয় করেন। রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করালেও সার্বিক প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। ফলে শপথের ঠিক আগে এই পদে পরিবর্তন প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। সব কিছু ঠিক থাকলে আজ (মঙ্গলবার) বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। ড. নাসিমুল গনিই অনুষ্ঠানটি সমন্বয় করবেন বলে জানা গেছে। এ কারণে তাঁর নিয়োগ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
স্থিতিশীলতা নাকি নতুন প্রবণতা: প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী। এখানে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন পরিবর্তন নীতিনির্ধারণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেটি যদি নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে প্রশাসনের স্বাভাবিক ক্যারিয়ার কাঠামো দুর্বল হয়।
তাদের মতে, রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ে প্রশাসনে রদবদল অস্বাভাবিক নয়। নতুন সরকার নিজের আস্থাভাজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চাইবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিল কি প্রশাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে?
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একদিনে তিনটি প্রজ্ঞাপন-একটি নিয়োগ, একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব, একটি বাতিল-প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এটি নিছক রুটিন রদবদল নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে রাজনৈতিক আস্থা, ক্ষমতার ভারসাম্য ও পেশাগত রেওয়াজের জটিল সমীকরণ। কারণ নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ-প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতার বার্তা দেওয়া। দ্রুত সিদ্ধান্ত কখনো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু ঘন ঘন পরিবর্তন আস্থার সংকট তৈরি করে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ব্যতিক্রম হিসেবেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে শীর্ষপদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও দ্রুত প্রজ্ঞাপন পরিবর্তনই হয়ে উঠবে নতুন স্বাভাবিকতা-সেই উত্তর সময়ই দেবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদটি কেবল প্রশাসনিক প্রধানের নয়; এটি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী। সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের জন্য দায়বদ্ধতা সমষ্টিগত, আর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রশাসনিক সমন্বয় করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। ফলে এ পদে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ঘন ঘন পরিবর্তন নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্প, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শীর্ষপদে দ্রুত রদবদল সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আইনসম্মত হলেও সেটি ব্যতিক্রমী প্রয়োজনেই সীমিত থাকা উচিত। রাজনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সেটি যেন প্রশাসনিক নীতির বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়-সেই সতর্কতাই এখন প্রাসঙ্গিক।
তিনি এটার বলেন, একদিনে প্রশাসনের শীর্ষপদে প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিল প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও পূর্বানুমানযোগ্যতার জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না। জনপ্রশাসন একটি ক্যারিয়ারভিত্তিক কাঠামো। এখানে পদায়ন ও নিয়োগে স্বচ্ছতা, জ্যেষ্ঠতার স্বীকৃতি এবং নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মচারী (চাকরি) আইন, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পদায়ন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও সেটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাই হওয়া উচিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যদি নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে ক্যারিয়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
