বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান
অতীতের সরকারগুলোর মতো বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বও নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণমাধ্যম সংস্কারে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি বলে স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছেন দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান। রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত 'বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬'-এর "টার্নিং পয়েন্টের পর সাংবাদিকতা" শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই হতাশার কথা জানান। জ্যেষ্ঠ এই সম্পাদক মনে করিয়ে দেন যে, নিরপেক্ষ ও নির্ভীক সাংবাদিকতা সুরক্ষা, দমনমূলক আইন বাতিল এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলোর ৩১ দফার রূপরেখা ও নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই রূপরেখা বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অর্থবহ সংস্কার উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের স্মৃতি তুলে ধরে মতিউর রহমান জানান, সে সময় সংবাদপত্রকে ধ্বংস করতে পরিকল্পিতভাবে বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সরকারের নির্দেশে ৫০টি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির অর্থনৈতিক ভিত গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছিল। এছাড়া ২০২৩ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাসহ তার নিজের বিরুদ্ধে প্রায় ৮০টি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে প্রথম আলোকে শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে সম্পাদক পরিবর্তন ও মালিকানা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য অবিরত চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়েও গভীর হতাশা প্রকাশ করেন মতিউর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন যে, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী, কিন্তু গণমাধ্যমকে কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা দিতে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অব্যাহত চাপের মুখে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে অসংখ্য পেশাদার সাংবাদিক তাদের চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। ভয় ও অনিশ্চয়তার চরম পরিবেশের কারণে প্রথম আলোসহ মূলধারার প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমকে চরম মাত্রায় আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপের আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর চরমপন্থী বিক্ষোভকারীদের তাণ্ডবে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে সংঘটিত বর্বরোচিত অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতিচারণ করে মতিউর রহমান গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করে জানান যে, হামলাকারীরা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি এবং পুরো ধ্বংসযজ্ঞ শেষ হওয়ার পরেই কেবল ফায়ার সার্ভিসকে সেখানে যেতে দেওয়া হয়েছিল। এর বিপরীতে তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কার মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশের প্রশংসা করেন। তীব্র সমালোচনামূলক সম্পাদকীয় প্রকাশ করা সত্ত্বেও সে সময় সম্পাদকদের কোনো ধরনের আইনি হয়রানির শিকার হতে হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রেস ফ্রিডমের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতি টেনে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন। অন্যদিকে "দীর্ঘ ৬৪ বছর সাংবাদিকতা ও লড়াইয়ের পরও আজ আমাদের শাসকদের মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে যে, কথা বলার অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কারও অনুগ্রহ নয়, এটা জনগণের মৌলিক অধিকার।" তিনি আক্ষেপ করে জানান যে, ৫৬ বছর পেশাদার সাংবাদিকতা করার পরও আজ তিনি নিজেকে সেই একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি তুলতে দেখছেন। উপস্থিত দেশি-বিদেশি চিন্তাবিদ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা তার এই বক্তব্যের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে অবিলম্বে গণমাধ্যম সুরক্ষা আইন প্রণয়নের তাগিদ দেন।