বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের মূল সংগ্রামটি কেবল হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর সূচনা হতে হবে মানুষের বসতবাড়ি, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং স্থানীয় সামাজিক কাঠামোর একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে।
দেশের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন যে, দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা, দরিদ্র রোগীদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু ও সার্বিক ভোগান্তি নজিরবিহীনভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
ড. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেন, "বর্ষার বৃষ্টিপাতকে যদি আমরা ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ার একটি অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক কারণ হিসেবে ধরে বসে থাকি, তবে এই সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হবে। কিন্তু প্রতিবার বৃষ্টির পরপরই যদি মাঠপর্যায়ে মশক নিধন ও প্রতিরোধমূলক তৎপরতা জোরদার করা যায়, তবে বাংলাদেশকে এই বার্ষিক জনস্বাস্থ্য দুর্ভোগ থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করা সম্ভব।"
তিনি বুঝিয়ে বলেন, বর্ষাকাল সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনলেও জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়। থেমে থেমে বৃষ্টি, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। ফলে প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, জুনের তুলনায় জুলাই মাসে ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে এবং জৈবিক চক্রের হিসাব অনুযায়ী আগস্টে এই প্রাদুর্ভাব আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
সাধারণ মানুষের ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়ে এই বিশেষজ্ঞ জানান, বৃষ্টি হলেই মশা মরে যায়—এ কথা ঠিক নয়। প্রাক-বৃষ্টির সময় পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা গাছের পাতা, ঝোপঝাড় বা ঘরের ভেতরের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয় এবং বৃষ্টি থামলেই পুনরায় কামড়াতে শুরু করে। অন্যদিকে এডিস মশার ডিমের গায়ে থাকা আঠালো প্রলেপ পাত্রের গায়ে শক্ত হয়ে লেগে থাকে। বর্ষার পানির স্পর্শ পেলেই তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয় এবং পরবর্তী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে তা পূর্ণাঙ্গ ভাইরাসবাহী মশায় রূপ নেয়, যা একজন আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে সুস্থ দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়।
বর্তমানে গৃহীত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে ড. মুশতাক বলেন, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—আমরা রোগী সংকটাপন্ন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রতিকারমূলক কাজে সক্রিয় হই। চিকিৎসার শেষ ধাপে গিয়ে এই অতিরিক্ত নির্ভরতা ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বড় হাসপাতালের আইসিইউ ও বিশেষায়িত সেবা মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি হলেও, রোগী যেন সেই জীবনসংকট অবস্থায় না পৌঁছায় তা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রাথমিক প্রতিরোধ ও সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ছাড়া কেবল তৃতীয় স্তরের (টারসিয়ারি) হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে মৃত্যুহার কমানো অসম্ভব।
তিনি তৃণমূল পর্যায়ে অবাধ ও দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি ও প্রান্তিক আয়ের মানুষের জন্য প্রারম্ভিক পর্যায়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা এখনও কঠিন। তাই জ্বর আসার সাথে সাথেই বিনামূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা গেলে প্রাথমিক অবস্থাতেই রোগীকে আইসোলেশন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া সহজ হবে।
আইইডিসিআরের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ডেঙ্গুকে কেবল স্বাস্থ্যসেবা খাতের একক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে এটিকে বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে যৌথভাবে এগিয়ে এসে অসুস্থ দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা কর্মহীন অবস্থায় পুষ্টিহীনতায় না ভোগেন।
সব ডেঙ্গু রোগীকে ঢাকার বড় বড় হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ বা স্থূলতায় ভোগা ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের শুরুতেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা পর্যায়ের মাধ্যমিক হাসপাতালেই সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। এর ফলে উপজেলা পর্যায়েই জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে এবং রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর অস্বাভাবিক চাপ কমে আসবে।
মশক নিধন প্রসঙ্গে তিনি সনাতন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কার্যকর লার্ভিসাইডিংয়ের তাগিদ দেন। শুধুমাত্র ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া দেওয়া বা মাঝেমধ্যে জরিমানা আদায় করাই এডিস দমনে যথেষ্ট নয়। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত যানবাহন, ছাদবাগান, খোলামেলা ড্রাম ও রাস্তার পাশের পাত্রে জমা পানিতে নিয়মিত লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ স্প্রে করতে হবে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় যেখানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয়, সেখানে নিরাপদে পানি ব্যবহারের প্রযুক্তি ও লার্ভানাশক বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলার মতো ডেঙ্গু প্রতিরোধেও একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু এককভাবে ঢাকা শহরের সমস্যা নয়; বরিশাল ও চট্টগ্রামসহ সারা দেশেই এটি দ্রুত ছড়াচ্ছে। তাই এটিকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে ঘোষণা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে মাঠে নামতে হবে।