বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

ছবি : সংগৃহীত
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে বাজারের তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক ক্রেতাও। একসময় চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ কিংবা ডিম কেজি ও ডজন হিসেবে কেনা হলেও এখন অনেকেই নির্দিষ্ট পরিমাণের বদলে ৫০, ১০০ কিংবা ২০০ টাকার পণ্য কিনছেন। কারও বাজার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এক পোয়া ডাল, এক হালি ডিম কিংবা কয়েকটি সবজিতে।
রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির কথাই জানান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী আরিফ। তার কেনাকাটার তালিকায় ছিল এক হালি ডিম, এক পোয়া মসুর ডাল, আধা কেজি পেঁয়াজ ও কয়েকটি রসুন।
আরিফ বলেন, মাস শেষ হতে এখনো কয়েক দিন বাকি। বেতনের টাকা বাড়িভাড়া ও সন্তানের স্কুলের খরচে শেষ হয়ে গেছে। তাই প্রয়োজন থাকলেও একসঙ্গে বেশি পণ্য কেনার সামর্থ্য নেই। বাধ্য হয়ে অল্প অল্প করে বাজার করতে হচ্ছে।
মগবাজারের এক বিক্রয়কর্মী জোবেদা জানান, আগে মাসের শুরুতেই চাল, আলু, ডাল, পেঁয়াজ ও চিনিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য একসঙ্গে কিনতেন। এখন প্রতিদিনের বাজার প্রতিদিন করতে হয়। কোনো দিন অল্প ডাল, কয়েকটি ডিম আর সামান্য মসলা কিনেই সংসারের খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যে কেনাকাটার পরিমাণ কমাচ্ছেন ক্রেতারা। তেল, ডাল, চিনি, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও মসলার ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি। কেউ ২০-৩০ টাকার কাঁচামরিচ কিনছেন, কেউ আবার ডজনের বদলে এক হালি ডিম নিচ্ছেন। ব্রয়লার মুরগিও অনেকে পুরোটা না কিনে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশ কিনছেন।
মগবাজারের নয়াটোলা এলাকার মাংস বিক্রেতা কবির জানান, আগে যেসব ক্রেতা কয়েক কেজি মাংস কিনতেন, তাদের অনেকেই এখন এক কেজিতে সীমাবদ্ধ থাকছেন। আবার অনেকে কেজির বদলে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মাংস চান।

তিনি বলেন, আগের তুলনায় বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দীর্ঘদিনের ব্যবসায় এমন পরিবর্তন তাদের জন্যও চাপ তৈরি করেছে।
ক্রেতারা কম পরিমাণে পণ্য কেনায় বিক্রেতাদেরও বাড়তি সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে। নয়াটোলার মুদি ব্যবসায়ী মো. হারুন মিয়া বলেন, আগে এক-দুই কেজি করে অল্প কয়েকজন ক্রেতার কাছে যে পরিমাণ ডাল বিক্রি হতো এখন তা বিক্রি করতে অনেক বেশি ক্রেতাকে সামলাতে হয়। ১০০ বা ২০০ গ্রাম করে পণ্য ওজন করতে গিয়ে সময় বাড়ছে, কিন্তু বিক্রি সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ছোট ছোট পরিমাণে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে পলিথিন ও প্যাকেটের ব্যবহার বেড়েছে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি কাজের চাপও বাড়ছে। সবজির ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণে বিক্রি করতে গিয়ে কিছু পণ্য অবিক্রীত থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে ক্রেতারা কম পরিমাণে পণ্য কিনলেও এতে অনেক সময় এককপ্রতি দাম বেশি পড়ে। যেমন, এক কেজি মসুর ডালের দাম ১৫০ টাকা হলে এক পোয়া ডাল কিনতে আনুপাতিক হিসাবে ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা হওয়ার কথা। কিন্তু এক পোয়া কিনতে ৪০-৪৫ টাকা নেওয়া হলে কেজিপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ১৬০-১৮০ টাকা।
অর্থাৎ একসঙ্গে বেশি পণ্য কেনার সামর্থ্য না থাকায় ক্রেতাদের অল্প পরিমাণে কেনাকাটা করতে হচ্ছে, আর সেই কেনাকাটাতেই বাড়তি অর্থ ব্যয় হতে পারে।
বাজারদরের চাপ সামাল দিতে টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি এবং খোলা বাজারে বিক্রির (ওএমএস) মতো কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে এসব সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে পণ্য না পেয়ে ফিরে যেতে হয় বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতাদের কেউ কেউ।
বাজার তদারকিতে অভিযান চালানো হলেও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু জরিমানা নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা।

বাজারের এই কাটছাঁট শুধু কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; প্রভাব পড়ছে পরিবারের খাবারের তালিকাতেও। মাছ, মাংস, ডিম ও ডালের পরিমাণ কমে গেলে শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এ ঝুঁকি বেশি।
পুষ্টিবিদ নিশাত লামিয়া বলেন, খাবারে বৈচিত্র্য কমে গিয়ে ভাত ও আলুর মতো শর্করানির্ভর খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়লে প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও জিংকের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিত্যপণ্যের দাম ও পরিবারের আয়ের মধ্যে ভারসাম্য না ফিরলে বাজারের এই কাটছাঁট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তখন সংকটটি শুধু পকেটের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি ও সামগ্রিক জীবনমানেও এর প্রভাব পড়বে।