বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন, লেভেল-৭ পুরানা পল্টন
ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০২২২৬৬৪০০৫৬
e-mail: [email protected],
[email protected]

মাহফুজ আনাম
স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান গড়ে তুলে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে বাংলাদেশের জনগণ ঐতিহাসিকভাবে অনন্য দক্ষতার পরিচয় দিলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বারবার চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন 'বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬'-এ বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই নির্মম ঐতিহাসিক সত্যটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, কোনো একনায়কের পতনের জন্য যখন লড়াই হয় তখন পুরো জাতি ইস্পাতকঠিন ঐক্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু একনায়ক হটার পরপরই সেই ঐক্য ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং একসঙ্গে লড়াই করা দলগুলো একে অপরের প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক পর্যালোচনা করে মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে একটি বর্বর সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ায় বারবার সামরিক অভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের উত্থান ঘটেছে। ১৯৯১ সালে গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর জাতি আশা করেছিল দেশে গণতন্ত্রের চিরস্থায়ী পুনর্জন্ম হয়েছে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে ব্যর্থ হয়, যার পরিণতিতে সংঘাত, হিংসা ও ধ্বংসের রাজনীতি জাতিকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই বারবার পতনের মূল কারণ হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে 'অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব' বা অতি-দলীয়করণকে দায়ী করেন দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক। তিনি বলেন যে, পুলিশ বাহিনীকে শাসক দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে অপব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকে দলকানা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করায় আইনের শাসনের ভিত্তি ধসে পড়েছে। মাহফুজ আনাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমনকি ডাক্তার ও সাংবাদিকদের মতো পেশাজীবী সমাজও আজ রাজনৈতিক পরিচয়ে গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অশনি সংকেত।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাহফুজ আনাম প্রশ্ন তোলেন, যে পেশার মূল চালিকাশক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা, সেখানে প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বন করে কীভাবে একজন সাংবাদিক সমাজে আস্থা ধরে রাখতে পারেন? তিনি মন্তব্য করেন যে, ব্রিটেন বা আমেরিকার মতো দেশেও দলগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকে, কিন্তু পুরো শাসনব্যবস্থাকে দলের শাখা অফিসে পরিণত করা হলে সেখানে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির চূড়ান্ত বিস্তার ঘটে। এই দুষ্টচক্র থেকে দেশকে বের করে আনতে শাসনব্যবস্থায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তি আমলাতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ করে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।
সম্মেলনে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের উদ্দেশে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, "আমরা স্বৈরাচারকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারদর্শী, কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আমরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়তে একেবারেই অপটু। এই দুর্বলতা কাটাতে না পারলে আমাদের জাতীয় সক্ষমতা অর্থবহ শক্তিতে রূপ নেবে না।" তিনি মনে করিয়ে দেন যে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর সরকারের আনুগত্য থাকা উচিত সার্বিক জনগণের প্রতি, কোনো বিশেষ দলের প্রতি নয়। দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা তার এই আত্মউপলব্ধিমূলক বক্তব্যকে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনে অবিলম্বে দলনিরপেক্ষ সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানান।